শেখ মুজিব: জাতির স্থপতি

শেখ মুজিব: জাতির স্থপতি

মাইকেল বার্নস, ভাইস প্রেসিডেন্ট, বঙ্গবন্ধু সোসাইটি

(বক্তৃতাটি ব্রিটেনের হাউস অব কমন্স কমিটি রুম এ দেয়া হয়েছিল।  ১৯৮০ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে ব্রিটিশ এই পার্লামেন্ট সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু সোসাইটির ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইকেল বার্নস এ বক্তৃতাটি দেন। বঙ্গবন্ধু সোসাইটি এই লেকচারটি আয়োজন করে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর প্রায় পাঁচ বছরের মাথায়। তখন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আলোচনা করা, কথা বলা একটু কষ্টকরই ছিল। বাংলাদেশে তো প্রায় দুরূহ ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সোসাইটি লন্ডনে এই আলোচনা সভাটি আয়োজন করতে সক্ষম হয়েছিল। সেখানে বাংলাদেশ থেকে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ড. কামাল হোসেন ও লন্ডন আওয়ামী লীগ সভাপতি গাউস খান বক্তৃতা দিয়েছিলেন। আর বাকি ৬ জন বক্তার প্রায় বেশিরভাগই ছিলেন ব্রিটেন ও ইনডিয়ার সংসদ সদস্য ও কূটনীতিক যারা বঙ্গবন্ধুকে অল্প সময়ের জন্য হলেও খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু সোসাইটির এই আলোচনা সভায় দেয়া বক্তৃতাগুলোর সংকলন করে ‘ট্রিবিউট টু মুজিব’ শিরোনামে একটি ক্ষুদ্র পুস্তিকা বের করেছিল বঙ্গবন্ধু সোসাইটি। সেখান থেকেই মাইকেল বার্নসের বক্তৃটাটি তরজমা করা হলো। তরজমা করেছেন সাবিদিন ইব্রাহিম।)

বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছে ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এটা ছিল আসলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর। বঙ্গবন্ধুও মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে স্বাধীন দেশে ফিরেছেন। সে সময় ব্রিটিশ পার্লামেন্ট একটি ক্ষুদ্র সংসদীয় প্রতিনিধি দল পাঠায়। এই ক্ষুদ্র প্রতিনিধি দলে মাত্র দুজন সদস্য ছিলেন। একজন ছিলেন মি. হিউ ফ্রেসার আরেকজন ছিলাম আমি। আমাদের দায়িত্ব ছিল ব্রিটেনের পক্ষ থেকে নতুন স্বাধীন হওয়া দেশটিকে শুভকামনা জানানো। নতুন দেশের শুরুতে শেখ মুজিবের সাথে দেখা হওয়ার পর আমাদের মনে হচ্ছিল কিভাবে একটি দেশ তাদের পরিচয় খুঁজে পেয়েছে, জাতীয়তাবোধের জাগরণ ঘটেছে। তিনি তার দেশের মানুষকে একটি পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি এনে দিতে পেরেছিলেন তার কারণ তিনি ছিলেন একজন বিশ্ব মানের রাষ্ট্রনায়ক। তাছাড়া তার ব্যক্তিগত কিছু গুণাবলীও ছিল যেমন তার কারিশমার কথা টম উইলিয়ামস তার বক্তৃতায় বলেছেন। কারিশমা মনে হয় রাজনীতিতে একটু বেশিই কাজ করে। অনেকেই বলে থাকেন ওমুক ওমুক নেতার কারিশমা আছে। তবে বঙ্গবন্ধুর মধ্যে কারিশমা পুরোপুরিই ছিল। তিনি কিভাবে তার জনগণ থেকে ভালোবাসা আদায় করে নেন এটা দেখবার মত বিষয়।

আমার মনে আছে আমার ঐ ফেব্রুয়ারির সফরে দেখেছিলাম কিভাবে শত শত লোক ঘন্টার পর ঘন্টা এমনকি দিনের পর দিন তার বাড়িতে, বাড়ির বাইরে অপেক্ষা করছে তার সাথে দেখা করার জন্য। শেখ মুজিবের উপর তাদের এতই আত্মবিশ্বাস ছিল যে তারা মনে করতো তাদের সব সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা একমাত্র তারই আছে। আমার কাছে মনে হয়েছিল বাংলাদেশ যে সংকট থেকে উঠেছিল সেখান থেকে উঠানো এবং এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কোন ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু মুজিব ব্যক্তিগতভাবেই হাজারো মানুষের সমস্যার সমাধান করেছেন। এটাই তার কারিশমার মাহাত্ম যে তার উপর মানুষ এত আত্মবিশ্বাস এবং আস্থা রাখতে পারতো।

দ্বিতীয়বার তার সাথে দেখা হবার পর তার আরেকটি গুণের সাথে আমার পরিচয় ঘটে যেটা আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। ১৯৭৩ সালের নভেম্বর মাসে আরেকটি সংসদীয় প্রতিনিধি দলের সাথে বাংলাদেশে আসি। সেই সময়ে অবশ্য আমরা প্রচুর ঘুরতে পেরেছিলাম। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যেটা সম্ভব ছিলনা সেটা ততদিনে মোটামুটি সম্ভবপর হয়েছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির ধ্বংসপ্রাপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার অনেক সংস্কার নিয়ে আসা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় এত ব্রিজ, কালভার্ট ধ্বংস করা হয়েছিল যে আমাদের প্রথম সফরে তেমন ঘুরার সুযোগ ছিলনা। এত অল্প সময়ের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার লক্ষণীয় পরিবর্তন আনা হয়েছিল।

১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর যে গুণটি আমার নজরে আসলো সেটা হলো তার দয়াপরায়ণতা। বাংলাদেশে আমাদের প্রতিনিধি দলের নেতা ছিলেন কনজারভেটিভ পার্টির পার্লামেন্ট সদস্য ডেভিড ক্রাউচ। ডেভিড ক্রাউচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কক্সবাজারে অল্প সময়ের অবস্থানের কথা জানান মুজিবকে। মুজিব যখন একথা শুনলেন তখন সাথে সাথে তার ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য রাখা হেলিকপ্টারটি দিয়ে আমাদের পুরো প্রতিনিধি দলকে ডেভিডের সেই স্মৃতি বিজড়িত জায়গায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। এটা ছিল তার চরিত্রের একটা অসাধারণ গুণ। আমরা ডেভিডের স্মৃতি বিজড়িত জায়গায় ভ্রমণ করলাম। এর মধ্যে আমরা আরও কয়েকটি যায়গায় ভ্রমণ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। শেখ মুজিবের এই বিশেষ ব্যবস্থা না থাকলে আমাদের পক্ষে এ অভিজ্ঞতা অর্জন করা একেবারে অসম্ভব ছিল। এটা শুধু মুজিবের ভদ্রোচিত আচরণের কারণেই সম্ভব ছিল।

তাই আমি খুব খুশি এবং আনন্দিত যে বঙ্গবন্ধু সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং তার সংগ্রামের পরিচিতির জন্য এমন একটা কাজ দরকার ছিল। আমি আজকের এই রাত থেকে এই সোসাইটি অনেক এগিয়ে যাবে এবং আগামী বছরও এমন সেমিনার আয়োজন করে যাবো যেটা বার্ষিক স্মারক বক্তৃতা হতে পারে। স্যার হ্যারল্ড উইলসন সে বক্তৃতাটা দিতে পারেন।

আমাকে কথা বলার সুযোগ করে দেয়ার জন্য চেয়ারম্যানকে ধন্যবাদ। আমি বঙ্গবন্ধু সোসাইটির সাফল্য কামনা করছি।

 

Related Posts

About The Author

Add Comment