সংস্কৃতি ভাবনা

সংস্কৃতি, সমাজ, সংস্কার এবং সভ্যতা একে অন্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জরিত। আমি এই বিষয়গুলো সম্পর্কে আমার মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করার প্রয়াস করবো। সংস্কৃতির সংজ্ঞা মনে হয় একশোর উপরে রয়েছে। কিন্তু আমি বলবো একজন মানুষের চিন্তা-চেতনার বহিঃপ্রকাশই হচ্ছে তার সংস্কৃতি। এই চিন্তা-চেতনা আবার অন্তর্ভুক্ত করে ভাষা, আচার-ব্যবহার, দৃষ্টিভঙ্গি,ঐতিহ্য, বিশ্বাস ইত্যাদি। নৃবিজ্ঞানীদের মতে অপসংস্কৃতি বলতে কিছুই নেই। আমার কাছে যা ভালো আপনার তা ভাল না লাগতেও পারে। যার কাছে ভালো না লাগে তার কাছে তা অপসংস্কৃতি হয়ে যায়। নৃবিজ্ঞানীরা প্রত্যেক মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্ব দিয়েছেন তা সহজেই অনুধাবন করা যায়। তবে আধুনিক সংস্কৃতি বোদ্ধাদের মতে অন্য ব্যখ্যা রয়েছে। তারা মনে করেন, সংস্কৃতি নিজের বলে কিছুই নেই। যা প্রতিটি মানুষের জন্য কল্যাণকর তাই সংস্কৃতি। যে সংস্কৃতি ব্যক্তিকেন্দ্রিক তাকে তারা সংস্কৃতি বলে মানতে কিছুটা দ্বিধাবোধ করেন কেননা ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংস্কৃতি অনেক সময় ব্যক্তিকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকে সমাজকে নয়। আর তাই তারা বলেন যা কিছু মানুষের জন্য কল্যাণকর তাই সংস্কৃতি।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে স্টাডি ফোরামের সাপ্তাহিক সেশন!

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে স্টাডি ফোরামের সাপ্তাহিক সেশন!

সংস্কৃতি দিনদিন বিবর্ধিত হয়। সে এক জায়গায় কখনো থাকতে পারেনা। সে দিকে দিকে ছড়িয়ে পরে। আবার অনেকে মনে করেন, সংস্কৃতি মানে হচ্ছে গান, বাজনা, নাচগান ইত্যাদি। এইগুলো সংস্কৃতির অংশ মাত্র। বৃহৎ অর্থে চিন্তা করতে গেলে সংস্কৃতির অর্থ এই দাঁড়ায় মনুষ্যত্ব অর্জন অর্থাৎ মনের মধ্যে ভালোত্বকে লালন করা, যে ভালোত্বের দ্বারা মানব কল্যাণ সাধিত হয়ে থাকে। কথাই আছে যারা গানবাজনা পছন্দ করেনা তারা মানুষ খুন করতে পারে। যেহেতু গানবাজনা মানুষের মনকে প্রভাবিত করতে পারে ভালকিছুর জন্য সেহেতু একে সংস্কৃতির অংশ ধরা যেতে পারে। এবার আসা যাক সমাজের দিকে মানুষের একতাবদ্ধ হয়ে বসবাস করাকে সমাজ নামে আমরা অভিহিত করে থাকি। যেহেতু মানুষ একা থাকতে নিরাপদবোধ করেনা তার সঙ্গীর প্রয়োজন সেহেতু মানুষ গোত্র হয়ে বসবাস করতে শুরু করে এবং একে অন্যের প্রয়োজনে পাশে এসে দাঁড়ায়। কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে এরা একত্রে বসে পরামর্শ করে যেটা এখনো গ্রামে লক্ষ্য করা যায়। আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রসারতার ফলে মানুষ এগিয়ে গিয়েছে অনেক দূর। সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে এখন মানুষ সমাজের কথা শুনে না। ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তা-চেতনার জন্য সভ্যতা এগিয়ে গিয়েছে অনেক দূর সেকথা অস্বীকার করার উপায় নেই, কিন্তু সে সমাজ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে।

আপনাদের মনে হয়ত প্রশ্ন জাগতে পারে তা কিভাবে? সভ্যতাকে আরো যুগোপযোগী করার জন্য ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের প্রবক্তা এমারসন বলেছিলেন, সভ্যতা বিনির্মাণের জন্য তোমাকে ব্যক্তিকেন্দ্রি চিন্তা করতে হবে। আর এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তাই পরবর্তীতে সমগ্র সমাজের, সমগ্র জাতির, সমগ্র পৃথিবীর চিন্তায় পরিণত হবে। তিনি সুন্দর করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তার কথা ব্যখ্যা করেছেন তার ভাষায়। পৃথিবীর ইতিহাসও তাই বলছে মহৎ ব্যক্তির চিন্তা একদিন সমগ্র মানবজাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। আমাদের একটা কথা মনে রাখতে হবে সব মানুষ মহৎ ব্যক্তি হননা। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের ধারণাকে আমি খারাপ বলছিনা আমি খারাপ বলছি এর প্রয়োগ বিধিকে। আগে মানুষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তা করতো নিজের এবং সমগ্র সমাজের জন্য কিন্তু আজ সে চিন্তা করে শুধু নিজের জন্য। তার মানে হচ্ছে আগে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তা সমগ্র সমাজের জন্য কল্যাণকর ছিল কিন্তু আজ তা পরিণত হয়েছে ভোগ্যনীতিতে যেখানে শুধু ব্যক্তিই সব সুবিধা ভোগ করে থাকে সমাজ নয়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের প্রবক্তারা বেঁচে থাকলে হয়তো আজ খুবই মনঃক্ষুণ্ণ হতেন কেননা তাদের ধারণাকে মানুষ উল্টোভাবে ভাবতে শুরু করেছে।

যেখানে তারা সমাজকে ভালবেসে, মানব জাতিকে ভালবেসে আরো কল্যাণকর করার তরে কাজ করেছিলেন সেখানে মানুষ আজ সমাজ বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। আজ আমেরিকাতে একজন মানুষ মারা গেলে তার পাড়া-প্রতিবেশিরা তা জানেননা। মরার পরে কিছুদিন পচে গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে তারপর তারা বুঝতে পারেন তিনি মারা গেছেন। এইটা তো কখনো কাম্য হতে পারেনা। কিন্তু এটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তাচেতনার ফল। মানুষ এতোই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে যে, সে চারদেয়াল থেকেই বের হয়না। যার দরুণ আমারিকায় এই পরিণতি। আমাদের দেশে যদিও এই পর্যায়ে পৌছোয়নি। এখনো এদেশের মানুষ একতাবদ্ধ হয়ে সমাজের কাজে এগিয়ে আসে, একসাথে মৃতদেহ কাঁধে তুলে কবর দিতে যায়। কিন্তু আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান এবং চক্ষু দিয়ে দেখতে পাচ্ছি তা ধিরে ধিরে আমেরিকানদের পরিণতির দিকেই যাচ্ছে। তাই আমাদের সাবধান হতে হবে। সমাজের দিকে নিজেদের দৃষ্টি দিতে হবে।

আগে জ্ঞানবিজ্ঞানে পিছিয়ে থাকা মানুষ তাদের ক্ষুদ্র বুদ্ধির বলে যদি সমাজকে টিকেয়ে রাখতে পারে তবে আজ আপনার আমার, আমাদের সবার জ্ঞানের উর্বরতার বুদ্ধি দিয়ে কেন সুন্দর সমাজ গঠন করতে পারবোনা একবার ভেবে দেখবেন কি? সংস্কার সম্পর্কে দুএকটি কথা বলে শেষ করবো। বিজ্ঞজন মাত্রই বলে থাকেন ছেলেটার সংস্কার আছে যদি তার মধ্যে কোন গুণ থেকে থাকে বা ব্যবহার মার্জিত হয়। এই সংস্কার আমরা পরিবার এবং সমাজ থেকে পেয়ে থাকি। যদি পরিবারের মধ্যে থাকে কোমলতা তবে আমরা কোমল হয়েই বেড়ে উঠবো আর যদি থাকে বর্বরতা তবে আমরা বর্বর হয়েই বেড়ে উঠবো। এই জন্যই শিক্ষাবিদরা পরিবারকে প্রাথমিক নৈতিক শিক্ষাকেন্দ্র বলে থাকেন। এখান থেকেই আমাদের বিশ্বাস জন্ম নেয় এবং পরবর্তীতে বটগাছ আকার ধারণ করে।

এখানে একটা কথা আছে সমাজ এবং পরিবার যে সবসময় সঠিক শিক্ষা দিয়ে থাকে তা আমি বলবনা। আর এর জন্যই আমরা শিক্ষা নিয়ে থাকি। এই শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে আমরা প্রকৃত সত্যে উপনীত হই। এই জন্যই বলি সংস্কার যে সবসময় ভাল তা কিন্তু নয়। পিতামাতা এবং সমাজ যদি কুসংস্কারে পুরিপূর্ণ হয় তবে শিশুর মনও কুসংস্কারে পূর্ণ হয়ে বেড়ে উঠবে। এর থেকে আমাদের মুক্তি দেয় প্রকৃত শিক্ষা। কথাই আছে, কোন দেশ, কোন জাতি, কোন মানুষ ঐতিহ্য ছাড়া এগোতে পারেনা। ছোট থেকে পেয়ে আসা সংস্কার তাকে আচ্ছন্ন করে, আটক করে রাখতে চায়; তবে যুক্তিভিত্তিক শিক্ষা আমাদের বৌদ্ধিক সংগ্রাম ও নান্দনিক চেতনার জোরে সংস্কার এর বাকল ফাটিয়ে বাহিরে বের করে নিয়ে আসে। আর তাই আমি প্রকৃত সংস্কারের জন্য বুদ্ধিভিত্তিক জ্ঞানচর্চা ব্যতীত মুক্তি সম্ভব নয় বলে মনে করি।

 

লেখক: Nirupam Niru

সমন্বয়ক, বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম, কুমিল্লা চ্যাপ্টার

Bangladesh Study Forum (Comilla chapter)

লেখক: নীরুপম নীরু

লেখক: নীরুপম নীরু

Related Posts

About The Author

Add Comment