সময় ও জীবনের মূল্য নিয়ে সেনেকার একটি অনন্য বই

বইয়ের নাম: অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ

লেখক : লুকিউস আন্নাইউস সেনেকা

অনুবাদক : সাবিদিন ইব্রাহিম

প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ

প্রকাশক : ঐতিহ্য

মূল্য: ১৫০

পৃষ্ঠা:৮০

রোমান দার্শনিক সেনেকার অমর কীর্তি ‘অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ’ প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষায় নিয়ে আসলো প্রকাশনা সংস্থা ঐতিহ্য। সেনেকার এ বইটি তার স্টোয়িক দর্শন  এবং নিগূঢ চিন্তার প্রতিফলন। এটি পলিনাস নামক এক আত্মীয়’কে উদ্দেশ্য করে লেখা। ২০০০ বছর আগে লেখা এ প্রবন্ধ গ্রন্থটির আবেদন আজও ফুরায় নি। মাত্র ৩৩ পৃষ্ঠার অতিকায় ক্ষুদ্র গ্রন্থটি আজও প্রাসঙ্গিক এবং বহুলভাবে সমাদৃত।

আমরা হরহামেশায় নিজের ভাগ্যের উপর দোষারোপ করি এবং সংক্ষিপ্ত জীবনের জন্য খেদোক্তি করি। আসলেই কি তাই?  আমাদের জীবন কি সত্যি অনেক ছোট? সেনেকা আমাদের দিকে প্রশ্নের আঙ্গুল তুলেছেন। আমরা সামান্য সম্পদের জন্য কার্পণ্য করি অথচ সম্পদের চেয়ে ঢের মূল্যবান সময়ের ব্যাপারে খুবই বেহিসেবি আচরণ করি। আমরা আমাদের সমগ্র জীবনে বৃথা সময় নষ্ট না করে যথাযথ ব্যবহার করতাম তবে সকলে কামিয়াবি হতে পারতাম। নশ্বর পৃথিবীতে অবিনশ্বর কৃতি স্থাপন করতে পারতাম।

বইয়ের নাম: অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ। লেখক : লুকিউস আন্নাইউস সেনেকা। অনুবাদক : সাবিদিন ইব্রাহিম। প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ প্রকাশক : ঐতিহ্য মূল্য: ১৫০

বইটিতে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা এসেছে। যেমন অনেকেই এই প্রশ্ন করে মানুষ কেন এতো অল্প দিন বাঁচে কেন, মানুষের জীবন এতো ছোট কেন?

অনেকের মাথায় এই প্রশ্ন জাগে-কত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণী, অনুজীব, ভাইরাস আছে যা মানুষের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি সময় বাঁচে কিন্তু মানুষ কেন এতো অল্প সময় বাঁচে? মানুষ যেখানে কতো বড় বড় কাজ করতে পারে সেখানে কিছু প্রাণীকে মানুষের চেয়ে পাঁচগুণ, দশগুণ বেশি সময় দিয়ে রাখা হয়েছে যাদের ভোজন-আহার ও বাচ্চা পয়দা ছাড়া আপাত আর কোন কাজ নেই।

মানুষকে কম সময় দেয়া হয়েছে এটি স্বীকার করতে সেনেকা নারাজ। তিনি মনে করেন, আমাদেরকে অল্প সময় দেওয়া হয়নি বরং আমরা আমাদের সময়ের বড় অংশটাই অপচয় করি। আমাদের সময়ের পুরোটা যদি ভালোভাবে কাজে লাগানো যায় তাহলে সে সময়ের মধ্যেই অনেক বড় বড় কাজ করাই সম্ভব।  কিন্তু এটা যদি হেলায় উড়িয়ে দেওয়া হয়, শুধু ভোগে বিলিয়ে দেওয়া হয়, কোন মহান উদ্দেশ্যে কাজে লাগানো না হয় তাহলে দেখা যাবে সময়টা কখন যে হাওয়ায় উড়ে গেছে, একেবারে টের পাওয়ার আগেই।

আমরা মহামানবদের জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখতে পাবো, তারা অনেক কম জীবন লাভ করলেও সফল হয়েছেন। তার কারণ তারা সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন। আমাদের মতো অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ নিয়ে বৃথা মাথা ঘামান নি। সেনেকা তার এ গ্রন্থে আমাদের প্রতি যে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, তা হলো ক্ষুদ্র জীবনের জন্য মিছে পরিতাপ না করে সময়ের যথাযথ ব্যবহার করা। তাহলে জীবনকে আর ছোট মনে হবে না।

বেশিরভাগ মানুষের দিন কাটে অতীতের অনুশোচনা আর ভবিষ্যতের দুর্ভাবনা নিয়ে। কয়জন পারে আজকের দিনটাকেই শেষদিন মনে করে পূর্ণ করে বাঁচতে? আর অনেকের দিন কাটে ভবিষ্যতের ভালো সময়ের অপেক্ষা করে।  সেনেকার প্রশ্ন ভবিষ্যতের কাছে দাবি-দাওয়া বা ভবিষ্যতের ভয় ছাড়া বর্তমানে বাঁচতে পারে কয়জন?

মানুষকে কম সময় দেয়া হয়েছে এটি স্বীকার করতে সেনেকা নারাজ। তিনি মনে করেন, আমাদেরকে অল্প সময় দেওয়া হয়নি বরং আমরা আমাদের সময়ের বড় অংশটাই অপচয় করি।

আমাদের সর্বোত্তম বন্ধু কারা হতে পারে? সেনেকা মনে করেন যাদের সংস্পর্শে, যাদের সঙ্গপানে আমরা সমৃদ্ধ হই, ঋদ্ধ হই তারাই আমাদের সর্বোত্তম বন্ধু। আমাদের সর্বোত্তম বন্ধু তারাই যারা তাদের সম্পদ আমাদের মাঝে অকৃপণভাবে বিলিয়ে দিতে সুখ পায়, আনন্দিত হয়। জ্ঞান ও দর্শন চর্চার সেই সব মহান পুরোহিতদের সংস্পর্শে আমরা কখনো ছোট হবোনা, দরিদ্র হবো না। তাদের ঘর থেকে বিতাড়িত হবো না বরং সমৃদ্ধ হয়ে বের হবো। সক্রেতিস, প্লাতো, অ্যারিস্টোটল, বুদ্ধ, পিথাগোরাস, লাও জু, কনফুসিয়াস, চাণক্যদের এমন সব বন্ধু মনে করেন সেনেকা।

রোমান দার্শনিক সেনেকা’র আলোড়ন সৃষ্টিকারী এ গ্রন্থটি বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে পরিচিত করে দেয়ার প্রয়াসে লেখক, অনুবাদক সাবিদিন ইব্রাহিম ইংরেজি ভাষা থেকে বাংলায় ভাষান্তর করেছেন। এবং আলোচ্য বইয়ের বিষয়ের সাথে সংগতিপূর্ণ কিছু বিষয় সংযুক্ত করেছে। তার এহেন উদ্যোগের জন্য তিনি সাধুবাদ পাবার দাবিদার। পরিশেষে বলতে চাই,  অনুদিত এ গ্রন্থটি উৎসাহী পাঠকে সমৃদ্ধ করবে, আলোড়িত করবে, তাদের সমৃদ্ধ জীবনের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে।

 

মিল্লাত মাফি

দর্শন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (বিডিএসএফ, ঢাবি)

Related Posts

About The Author

Add Comment