সরদারের বই ‘আমি মানুষ’

বুক রিভিউ-০১
বই: আমি মানুষ
লেখক: সরদার ফজলুল করিম
রিভিউ: আতা গাছ
—————————————

পুরো বইটির মধ্যে সবচেয়ে ভালো লেগেছে শেষের দিকের ‘মহৎ কোনো চিন্তার সাক্ষাৎ পেলে চিন্তাটি কার সে প্রশ্নের চেয়ে বড় হচ্ছে চিন্তার মহত্ত্বটি। মহৎ সত্যের যেমন কোনো বিকল্প নেই, তেমনি মহৎ চিন্তার মালিকানা নিয়েও বিরোধের কোনো হেতু নেই।’

দর্শণ আর রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কিংবদন্তীতুল্য মহান শিক্ষক সরদার ফজলুল করিম বইটি ‘মানুষ’কেই উৎসর্গ করেছেন। বইটিতে একজন মানুষ হিসেবে নিজের ব্যাক্তিগত জীবনের প্রতিদিনকার কষ্ট, যন্ত্রণা, হতাশা আর তামাশাকে তিনি দর্শনের মাপকাঠিতে বিচার করে দর্শনের কচকচানিমুক্ত সহজ ভাষায় তুলে ধরেছেন। একজন সাহিত্যের ছাত্রও এই বইটি পড়তে গিয়ে সাবলীল রচনাশৈলীর গুনাবলী সম্পন্ন কোন লেখকের জনপ্রিয় কোন ছোটগল্প মনে করবে। অথচ আগাগোড়া বইটিতে স্থান পেয়েছে মানুষের নিত্যদিনের দর্শন।

যতটা সহজে জীবনকে দেখা যায়, জীবনকে বিশ্লেষণ করা যায়, যতটা সহজে যাপিত জীবনের আখ্যানচিত্র এঁকে মানুষের জন্য লাগসই করা যায়,গ্রন্থটি এরই এক অনবদ্য উদাহরণ। ক্যালেন্ডারের তারিখ ধরে ধরে প্রতিদিনের ঘটনা, খবরের কাগজে প্রকাশিত সংবাদ ও লেখা, মানুষ,প্রকৃতি আর বস্তুরাজির সঙ্গে মানুষের যে মিথস্ক্রিয়া, এর বিবরণ এখানে আছে।

মানুষ জীবনের প্রত্যাহিক ঘটনাবলীর দার্শনিক ব্যাবচ্ছেদের পাশাপাশি এই বইটিতে বাড়তি আকর্ষন হলো সরদারের দার্শনিক ফুটনোট, টীকা-টীপ্পনি আর অন্তদৃষ্টি। বুদ্ধিবৃত্তিক প্যাঁচগোচহীন সাবলীল ভাষায় সরদার তার মনের কথা ব্যাক্ত করেছেন অবলীলায়। যখন যাঁর লেখা, বক্তব্য তাঁর ভালো লাগছে, নি:সঙ্কোচে তিনি তা বলে দিচ্ছেন, কারও কারও লেখা কেটে রাখছেন, পরে পড়বেন বলে। কিন্তু সেগুলো আদৌ কখনো পড়া হবে কি না, দ্বিধাহীনভাবে সে দ্বিধাও প্রকাশ করেছেন।

বইটিতে সরদার এমন কিছু বিষয় তুরে ধরেছেন যা একজন সচেতন পাঠককে নতুন চিন্তার খোরাক জোগায়। যেমন, নিজেকে তিনি বলদ বলেছেন। কিসের বলদ? বইয়ের বলদ। বই কী? ‘বই অবশ্যই লিখিত এবং মুদ্রিত, মানুষের এক মহৎ আবিষ্কার। কিন্তু তথাপি, যে দেশে বই পাঠ করা হয় না, অক্ষম আমার বাসার মতো কেবল স্তূপ করে রাখা হয়, তা বস্তু বটে তবে বই নয়। যে বই পঠিত হয়, কিন্তু এর বিষয়বস্তু আলোচিত হয় না, তার বক্তব্য অনুসৃত হয় না, সে বইও বই নয়। বস্তুমাত্র।’

বইটিতে নিজের ভালো লাগা কিছু বইয়ের কথা জানিয়েছেন। যেমন, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের শাহজাদা দারাশুকো। অ্যারিস্টটলের জন্য তাঁর অপরিসীম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার বয়ান আছে এই বইতে। সরদার লিখেছেন, ‘অ্যারিস্টটলের জন্য আমার মায়া হয়। আড়াই হাজার বছর বয়সী বৃদ্ধ অ্যারিস্টটল। তিনি আমাকে আজও মুগ্ধ করেন। অ্যারিস্টটলের পলিটিকসের গায়ের ধুলো আমার গায়ের জামা দিয়েই মুছলাম।’ আরেকটি বই মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের ‘সুন্দরের সংগ্রাম ও বুদ্ধিবাদের ট্র্যাজেডি’র উল্লেখ করেছেন তিনি। বলেছেন, বইটির লেখক তাঁর অচেনা কিন্তু তাঁর রচনা জীবনসত্যের দলিল।

এ বইয়ে লেখক বাংলাদেশের রাজনীতিকে তুরে ধরতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের শিশুতীর্থ থেকে উদ্ধৃত করেছেনঃ ‘কিন্তু সূর্য আর ওঠে না। অন্ধকার গভীর থেকে গভীরতর হয়। আর্তনাদ ওঠে। এখন কি উপায়? কোথায় যাব আমরা? কোথায় যাচ্ছি? এখন কে আমাদের পথ দেখাবে? ’

একজন মানুষের সাথে আরেকজন মানুষের পারষ্পরিক সম্পর্কের রসায়ন ব্যাবচ্ছেদ করতে গিয়ে তিনি বারবার ক্লান্ত হয়েছেন। কখনো কখনো হতাশ হয়েছেন। মানুষের প্রতি ক্ষোভ আর বিরক্তি প্রকাশ করেছেন কিন্তু মানুষের ওপর আস্থা হারাননি কখনো। চূড়ান্ত বিচারে তিনি তাই জীবনবাদী, আশাবাদী। আশায় বুক বেঁধে অন্যত্র তিনিই আবার বলেছেন, ‘জীবন বনাম মৃত্যুর যে লড়াই আজ চলছে, তাতে জীবনই জয়ী হবে, মৃত্যু নয়।’

মানবিক দর্শনের ক্ষুদ্র আকর অথচ বৃহৎ চিন্তাকে ধারণকরা এই বইটি না পড়লে মানুষ হিসেবে কিছু বিষয় সারা জীবন হয়তো আপনার না জানাই থেকে যাবে। তাই দেরি না করে প্রথম সুযোগেই পড়ে নিন বইটি।

 

-আতা গাছ

Related Posts

About The Author

Add Comment