সহজ ভাষায় “দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ”

মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী মানব ইতিহাসের বিকাশ দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী প্রক্রিয়ায় ঘটে। এই বিকাশ কারণ ব্যতীত আপনা-আপনি দৈব মায়ায় সম্পন্ন হয় না। এর পেছনে রয়েছে বস্তুর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব(বিরোধ) এবং বাহ্য পরিস্থিতির সঙ্গে যে দ্বন্দ্ব তারই পরিণতি। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ নিছক দর্শন নয়, বরং বিজ্ঞানের সমগোত্রীয়। যেহেতু দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ বিজ্ঞান থেকে শক্তি আহরণ করেছে বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জগত ও জীবনের সার্বিক বিশ্লেষণ এবং ব্যাখ্যা দান করে তাই একে বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদও বলা হয়। এই একটিমাত্র দর্শন দিয়ে তাবৎ দুনিয়ার যাবতীয় বিষয়কে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। মার্কস এর দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের দর্শন পৃথিবীর ইতিহাসকে খুব জোড়ে আঘাত করেছে। বলা যায়, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের দর্শন পৃথিবীর ইতিহাসকে পাল্টে দিয়েছে অথবা পৃথিবীর ইতিহাস বস্তুবাদের দ্বান্দ্বিক নিয়মে পরিবর্তিত হয়েছে,আর মাক্স শুধু প্রকৃতি থেকে বস্তুবাদের দ্বন্দ্বদর্শনের সূত্রকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের দর্শনের মাধ্যমে সমগ্র জ্ঞানকান্ড মোটা দাগে দুইভাগে ভাগ হয়ে গেছে। তাহল- ভাববাদ(Idealism) ও বস্তুবাদ(Materialism)। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ কি? দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে দ্বান্দ্বিকতা(Dialectical) কি? মার্কস দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মূল সূত্রটা নেন হেগেলের দ্বান্দ্বিকতাবাদের দর্শন থেকে। হেগেলের মতে, সভ্যতার বিকাশ হয় দ্বান্দ্বিক উপায়ে বা প্রক্রিয়ায়। হেগেলের দ্বান্দ্বিকতা (Dialectics) হল তিনটি বিষয়ের সমন্বয়-প্রস্তাব(Thesis),প্রতিপ্রস্তাব(Anti-thesis),সংশ্লেষণ(synthesis)। বিষয়টা সোজা ভাষায় এরকম- কেউ একটা কথা বা প্রস্তাব বলল অর্থাৎ থিসিস দিল । আরেকজন কথাটার প্রতিবাদ বা প্রতিপ্রস্তাব করল অর্থাৎ এ্যান্টিথিসিস দিল। এই বাদ(Thesis) প্রতিবাদের(Anti-thesis) মধ্য থেকে যে নতুন অধিকতর গ্রহণযোগ্য কথাটির উৎপত্তি হয় তা হল synthesis. সিনথিসিসের মাধ্যমে প্রাপ্ত নতুন চিন্তাটি নতুন প্রস্তাব(থিসিস) হিসাবে কাজ করবে আবার একটা পর্যায়ে এর প্রতিপ্রস্তাব(এ্যান্টিথিসিস) আসবে। একইভাবে “থিসিস” ও “এ্যান্টিথিসিসে”র সংশ্লেষণে নতুন থিসিস তৈরী হবে এবং এভাবে সভ্যতার বিকাশের দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া চলতে থাকবে অনির্দিষ্টকালের জন্য…. এটাই হল দ্বান্দ্বিকতাবাদ। সভ্যতার বিকাশের দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া চিরন্তন এবং এভাবেই পুরাতন সমাজ ভেঙে নতুন সমাজের জন্ম হবে। সভ্যতা এক স্তর থেকে আরেক স্তরে উন্নীত হবে। এখন প্রশ্ন হল,এই প্রস্তাব-প্রতিপ্রস্তাব কিভাবে তৈরী হবে?? হেগেলের দর্শন অনুযায়ী এই প্রস্তাব-প্রতিপ্রস্তাব তৈরী হবে ভাবের(idea) মাধ্যমে। এই জায়গায় এসে হেগেল ভাববাদী দার্শনিক কিন্তু মার্কস এর মতে প্রত্যেকটা বিষয়ের পেছনে একটা বস্তু(matter) কাজ করে। অর্থাৎ এই প্রস্তাব-প্রতিপ্রস্তাব আসবে ভাব থেকে নয় বরং বস্তু থেকে। এখানে এসে মার্কস বস্তুবাদী দার্শনিক আর এটাই হল মার্কসীয় দর্শনের ‘দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ’। বস্তুবাদের এই দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া বৈজ্ঞানিক উপায়ে মানব সমাজে চলতে থাকবে এবং এভাবে মানব সভ্যতা এগিয়ে যাবে বা বিকাশ লাভ করবে। এটাই হল দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। এই প্রক্রিয়াকে আবার বস্তুবাদের দ্বন্দ্বদর্শন(materialist dialectics)ও বলা হয়

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে বস্তু বা বস্তুতত্ত্ব কি?? বস্তুর সংজ্ঞায়ন একটু কঠিন। সহজ ভাষায় বলা যায়- যা কিছু আমরা ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে উপলদ্ধি করি,যা ইন্দ্রিগোচর বস্তুর মূল স্বরূপ,যা স্হান বা দেশজুড়ে থাকে(যার দৈর্ঘ্য প্রস্হ এবং ঘনত্ব আছে) যা কম বেশী চাপ প্রতিরোধ করে এবং ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে যার গতি বুঝা যায় তাকেই আমরা বস্তু বলতে পারি। ইন্দ্রিয় বলতে এখানে শুধুমাত্র মানুষের জন্মগত ইন্দ্রিয়ের শক্তিকেই বুঝলে চলবে না। অনুবীক্ষণ,দূরবীক্ষণ, শব্দ প্রসারক ইত্যাদি যন্ত্রের সাহায্যে বহু গুনে শক্তিশালী হয়ে উঠা ইন্দ্রিয়কেও ধরতে হবে।

এখন আমরা মার্কস এর ‘দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী’ দর্শনকে মার্কস এর প্রস্তাবিত কমিউনিজম বা শ্রেণীহীন সমাজ দ্বারা বোঝার চেষ্টা করি। আমরা জানি, পুঁজীবাদের বিকাশের একটা বিশেষ পর্যায়ে এসে মার্কস কমিউনিজমের প্রস্তাব দেন। অর্থাৎ পুঁজিবাদ ঐ সময়ে বিরাজমান ছিল থিসিস হিসাবে। মার্কস ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদের বিপরীত প্রতিপ্রস্তাব বা এ্যান্টিথিসিস হিসাবে কমিউনিজমের প্রস্তাব দেন। এই থিসিস (পুঁজিবাদ)এবং এ্যান্টি থিসিসের(কমিউনিজম) মিথস্ক্রিয়ায় সভ্যতা দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী প্রক্রিয়ায় নতুনভাবে বিকশিত হয়েছে। আর এই নতুন বিকাশটা একটা প্রস্তাব হিসাবে দেখা দিয়েছে। পুঁজিবাদ এবং সমাজতন্ত্রের অর্থব্যবস্থার দ্বান্দ্বিকতার সংশ্লেষণে তৃতীয় একটা অর্থব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে আর সেটা হলো মিশ্র-অর্থব্যবস্থা(!…?)। এখানে এসে মাক্সীয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দর্শন দ্বান্দ্বিক উপায়ে নিজের প্রস্তাবকে নাকোচ করে নতুন রিলেশন অব প্রডাকশন তৈরী করে।

এখন কথা হলো, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ যেহেতু বৈজ্ঞানিক এবং মানব সমাজের অন্তঃদ্বন্দ্ব যেহেতু চিরন্তন তাই সভ্যতার বিকাশের এক পর্যায়ে মানুষের আচরণগত মৌলিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে শ্রেণীহীন সমাজ বিকাশ লাভ করতে পারে বস্তুবাদের দ্বান্দ্বিক নিয়মে।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, মার্কস প্রস্তাবিত কমিউনিজম বা শ্রেণীহীন সমাজে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের দর্শন কাজ করবে কিনা?? মানব সমাজ যেহেতু গতিশীল তাই বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদ শ্রেণীহীন সমাজেও একইভাবে কাজ করবে। একটা বিশেষ পর্যায়ে শ্রেণীহীন সমাজে দ্বন্দ্ব তৈরী হবে এবং নতুনভাবে ইতিহাস দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী উপায়ে বিকাশলাভ করবে। এই জায়গায় এসে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ তার ঈশ্বরকেও অস্বীকার করে,তার বাপকেও ছাড়ে না।

একইভাবে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ নিজেও নিজের জন্য হুমকিস্বরূপ। আমরা জানি, বিজ্ঞানে ধ্রুব সত্য বলতে কিছু নেই। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ যেহেতু নিজেকে বৈজ্ঞানিক মনে করে সে জায়গায় এসে, সে নিজেকেও অস্বীকার করে। বৈজ্ঞানিক উপায়ে জীবন ও জগতকে ব্যাখ্যা করার জন্য যদি নতুন কোন দর্শনের উদ্ভব ঘটে তাহলে সেটি দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের প্রতিপ্রস্তাব হিসাবে দেখা দিবে। তখন প্রস্তাব ও প্রতিপ্রস্তাব থেকে দ্বান্দ্বিক উপায়ে নতুন প্রস্তাবের জন্ম হবে। এই জায়গায় এসে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ নিজেকে নিজেই অস্বীকার করে। সভ্যতার এই চিরন্তন দ্বান্দ্বিকতা চলতে থাকুন, মানব সমাজ সামনে এগিয়ে যাক…..

Related Posts

About The Author

Add Comment