সাজিদ উল হক আবিরের ‘আয়াজ আলীর ডানা’: সমসাময়িক জীবন সঙ্কটের প্রতিচ্ছবি

জীবনকে খুব কাছ থেকে অবলোকন করে গল্পকার সাজিদ উল হক আবির ফুটিয়ে তুলেছেন মধ্যবিত্ত জীবনের সঙ্কট। বইটির দশটি গল্পেই সময়ের হুবহু চিত্র বর্ণিত হয়েছে। ‘আয়াজ আলীর ডানা’য় আধুনিকোত্তর যুগের সমস্যা ও সঙ্কটগুলোকে নিরীক্ষার মাধ্যমে গল্পকার উপস্থাপণ করেছেন।

গল্পগ্রন্থের সবগুলো গল্পের কাহিনী খুব সরল ও সাবলীল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে পেট্রোল বোমার উদ্ভব, ব্যপক ব্যবহার ও নিরাপরাধ মানুষদের মৃত্যুর মত মর্মান্তিক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে বইটিতে। আবার নিজের মতামত প্রতিষ্ঠার ঐকান্তিক চেষ্টা, ভীক্ষার থালা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন, “স্বজাতির প্রতি ভালোবাসা”, প্রেম ও সংসারে ব্যর্থ যুবক,  এমনকি চোরের দৈনন্দিন জীবনও অঙ্কিত হয়েছে। তাছাড়া ঈশ্বরের আরাধনার প্রতি আগ্রহ, হিন্দু মুসলমান বৈষম্য, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির প্রতি সবার অধিকার, লেখক-কবিদের অবহেলিত জীবন, আপনজনের মৃত্যু, টিউশনী, ছাত্রীর সাথে প্রেম প্রভূতি কাহিনীর উপর নির্ভর করে ঘটনার সম্প্রসারণ হয়েছে।

উপজীব্য বিষয় হিসেবে গল্পকার বেছে নিয়েছেন অস্তিত্বসঙ্কট, সিদ্ধান্তহীনতা, আত্নপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা, শ্রেণিবৈষম্য এবং দৃশ্যমান ঘটনার অন্তরালের বাস্তবতা। প্রথমত, বইটির প্রায় পুরোটা জুড়ে রয়েছে অস্তিত্বসঙ্কট। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে বেকার দিশেহারা তরুণদের আষ্টেপৃষ্টে ঘিরে আছে অসহায়ত্ব। তারা আগামীর দিনগুলো নিয়ে অনিশ্চিত। ‘মাঝারি মাপের সুখ দুঃখ’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রের টিউশনীর বেতন না পাওয়া এবং বাসে লাঞ্চিত হওয়ার ঘটনায় মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়ন প্রতিফলিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ধাপে মানুষ মুখোমুখি হয় বিভ্রান্তির। সিদ্ধান্ত নিতে প্রায়ই ইতস্তত করতে হয়। আবার যে সিদ্ধান্ত নেয়, সেটা কখনোবা আত্নবিধ্বংসী হয়ে দাঁড়ায়। ‘গর্ত’ গল্পে কফিল মুখোমুখি হয় এমন একটি মুহূর্তের। পেট্রোলবোমা নিক্ষেপকারী এসে প্রাণভীক্ষা চায় চা-সিগারেট বিক্রেতা কফিলের কাছে। অনেক ভেবে জানালা দিয়ে পুকুরে আত্নগোপনের পথ করে দেয় সে। কিন্তু পরোক্ষণেই ফুটপাতে বসলে পেট্রোলে ঝলসে যায় তার শরীর। তৃতীয়ত, নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার এক অঘোষিত যুদ্ধে মেতে আছে পৃথিবীর মানুষ। ‘ভালোবাসার রঙ লাল’ গল্পটিতে শুধু একটি সিদ্ধান্তে পার্থক্যের জন্য খুন হয় জয়ন্ত। চতুর্থত, শ্রেণিবৈষম্য মোড়লের মত আসন পেঁতে বসে আছে। ‘জীবনের পেয়ালায় অতিরিক্ত কয়েক চুমুক’ গল্পে “প্যারালাইজড বৃদ্ধা ভিখারী”, “দামী আরমানি ব্রান্ডের পারফিউমের সুঘ্রাণ’ মাখা তরুণ শ্রেণিবৈষম্যের প্রতিভূ। আবার, ‘বিশখালীর চাঁদ’ এ নূর আলীর প্রতি কামরুলের প্রথম দিকের মন্তব্যও কর্মজীবী মানুষদের প্রতি তুলনামূলক উচ্চশ্রেণির মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হয়। এবং দৃশ্যমান ঘটনার আড়ালেও যে আরেকটা সত্য লুকিয়ে আছে, সেটা অন্তদৃষ্টি ছাড়া অবলোকন করা সম্ভব না। এভাবেই গল্পকার পরম মহিমায় আধুনিকোত্তর যুগে মানুষ যে সমস্ত সঙ্কটের মুখোমুখি হতে হয়, সেগুলোই মূল উপজীব্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিংসুক আর নূর আলী তার জলন্ত উদাহরণ।

সর্বোপরি, ‘আয়াজ আলীর ডানা’র অধিকাংশ গল্পে গল্পকার সরাসরি প্রবেশ করেছে। গল্পকার ও পাঠকের মিলন উত্তর আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ঠ্য। তাছাড়া সাবলীল বর্ণনায় ফুটে ওঠা চিত্রকল্পের প্রভাব প্রায়শই বর্ণিত হয়েছে ঘটনার শেষে। পাঠককে বেগ পোহাতে হয়নি গল্পের গূঢ় অর্থ উদ্ধারে জন্য। গল্পগুলোর বিষয়বস্তু, বাস্তবভিত্তিক কাহিনী, অভিনব চরিত্র, অলঙ্করণ সাজিদ উল হক আবিবের নিরীক্ষাধর্মী সৃষ্টিশীলতার প্রমাণ দেয়। দশটি গল্পের মাধ্যমে গল্পকার জীবনের পুরো অবয়বকে তুলে ধরেছেন।

-সাফি উল্লাহ

কথাসাহিত্যিক

Related Posts

About The Author

Add Comment