সাজিদ উল হক আবির এর ‘আয়াজ আলীর ডানা‘য় ভর করে

লেখকের বড় কৃতিত্ব হচ্ছে পাঠককে ভুলিয়ে বালিয়ে তার জগতে নিয়ে যাওয়া এবং তাদের মাথা-মগজ নিয়ন্ত্রণ করা। সাজেদ উল হক আবীরের ‘আয়াজ আলীর ডানা’ পড়ে পাঠক নিজেকে সে চরিত্রের সাথে মিলিয়ে ফেলে সুখবোধ করতে পারবে। আয়াজ আলীর ডানা একজন শিল্পীর শিল্পী জীবন এবং সংসার জীবনের মধ্যে ফারাক গোচানোর সংগ্রামের কাহিনী। সংসার, প্রেম, স্ত্রী-সন্তান এর নৌকা বাইতে বাইতে কিভাবে শিল্পী জীবনের সাথে কম্প্রোমাইজ করতে হয় তার করুণ বিবরণ পরতে পরতে। বেশিরভাগ তরুণ লেখক বা শিল্পী আয়াজ আলীর কাহিনীর সাথে মেলাতে পারবে। কারণ প্রত্যেকেরই মনে এমন আকাঙ্খা উকি মারে যখন পাখা মেলে উড়তে ইচ্ছে করে, স্বপ্নের জগতে বসবাস করতে ইচ্ছে করে। গ্রীক মিথের ইকারাসের মতো উড়ার দুরন্ত বাসনা যেমন তার মহাপতন নিয়ে এসেছে তেমনি তার মহাপতনও যে মহাসফল তার উদাহরণ হচ্ছে তার কয়েক হাজার বছর পরে সেই মানবপ্রজাতি চাঁদ জয় করে, ও সৌরজগত ভ্রমণ শেষে মহাবিশ্বে উড়ে বেড়াচ্ছে। মানুষ এখন ইকারাসের পাখা নিয়ে শুধু একাই ঘুরে বেড়াচ্ছে না, কয়েকশত লোককে একসাথে নিয়ে বিশাল ফড়িংয়ের পেটে আরামছে ভ্রমণ করছে হাজার হাজার মাইল। ইকারাসের এই মিথটি ইংরেজি সাহিত্যে সফল প্রয়োগ করেছেন সাহিত্যের জন্য শহীদ(!) জেমস জয়েস। তার ‘দ্য পোট্রেট অব দ্য আর্টিস্ট এজ অ্যান ইয়াং ম্যান’ এর স্টিফেন দেদালাস চরিত্রটি নির্মাণের মাধ্যমে। স্টিফেন দেদালাসকে আমরা তার ‘ইউলিসিস’ ও ‘ফিনেগেনস ওয়েক’ উপন্যাসেও পাই। স্টিফেন দেদালাস নামটির দুটি অংশ-‘স্টিফেন’ ও ‘দেদালাস’ । দেদারাস ছিলেন শিল্পী মানুষ, ইকারাসের বাবা। রাজার দ্বীপান্তর নির্বাসনের শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য আকাশপথই বাছাই করেছিলেন। কারণ জলপথ ও স্থলপথে রাজার সৈন্য সামন্ত প্রহরায় ছিল। মোমের তৈরি সেই পাখা মেলে উড়ার আগে ছেলে ইকারাসকে সতর্ক করেছিলেন বাবা দেদালাস যেন সে এত উপরে না উঠে যার কারণে সূর্যের কাছে চলে যায় আবার সাগরের কাছেও যেন চলে না যায় যার কারণে পাখায় পানি জমে পাখা ভারি হয়ে যায়। তাকে অনুসরণ করার আদেশ দিয়ে আকাশে উড়ছিলেন বাবা ছেলে। কিন্তু নতুন পাওয়া পাখা এবং উড়ার ক্ষমতা দিয়ে সে যেন উপরের দিকেই উড়তে ছিল। এটা এক অপূর্ব স্বাধীনতা! মানুষ দেখলো সে দেবতার মতো, ঈশ্বরের মতো, স্বর্গদূতের মতো আকাশে উড়ছে। ইকারাস যেন মানুষের দুর্দমনীয় জানার আকাঙ্খা, অর্জন, দেখা ও জয় করার আকাঙ্খার সার্থক প্রতিমূর্তি। সেই ইকারাস ঠিকই সেই আকাঙ্খার বলে একসময় সূর্যের কাছাকাছি চলে যায়। কিন্তু মোমের পাখা গলে যেতে থাকে ইকারাসের। একসময় দেখে সে শুধু হাত দিয়েই ঝাপটাচ্ছে কিন্তু আর উড়তে পারছেনা। শেষে আকাশ থেকে একটি সাগরে পরে সলিলসমাধি ঘটে। ইকারাসের এই মহাপতন কয়েক হাজার বছর ধরে মানুষের কল্পনাশক্তিকে মশলা সরবরাহ করেছে। ইকারাস এবং তার বাবা দেদালাস এর আকাশে উড়ার অদম্য আকাঙ্খা, এর একদিকে সফল ও অন্যদিকে ব্যর্থ প্রয়াস বিভিন্নভাবে শিল্প, সাহিত্য ও নাটকে উঠে এসেছে। ক্রিস্টোফার মার্লোর ডক্টর ফস্টাস একটি সার্থক উদাহরণ। বিশ শতকে জেমস জয়েস এই মিথটাকে সবচেয়ে সফলভাবে ব্যবহার করেছেন। শিল্প হচ্ছে শিল্পীর কাছে সেই ইকারাসের ডানা যার মাধ্যমে দূর আকাশে, দূর অতীতে বা দূর ভবিষ্যতে উড়ে বেড়ানো যায়। জেমস জয়েস ইংরেজি সাহিত্যের দেদালাস। ইকারাসের বাবার মতো শিল্পী তিনি, শিল্পের জন্য ত্যাগ করেছেন অনেক; দেশ, পরিবার এমনকি ধর্ম। সাহিত্য হয়ে উঠে তার কাছে আরাধ্য বিষয় এবং সেই মন্দিরেই সারা জীবনের সব পূজা জমা করেছেন। দেদালাস যেমন উড়ে গিয়ে মুক্ত হতে পেরেছেন কিন্তু সেই মুক্তির ফলও যে কম তেতো নয়! একজন বাবার সব সাফল্যই ম্লান হয়ে যায় ছেলের এমন করুণ মৃত্যুর কাছে। জয়েস তার ‘ইউলিসিস’ নিয়ে বলেছিলেন তিনি সেখানে এমন সব রসদ দিয়েছেন যা আগামী কয়েক শতকের সাহিত্য সমালোচকদের মাথা কুড়ে মরার জন্য যথেষ্ঠ। বিশ্বকে তিনটি কালজয়ী উপন্যাস, একগুচ্ছ ছোটগল্প, অনেকগুলো কবিতা উপহার দিয়ে গেলেও তার মৃত্যুর পর অন্তেষ্টেক্রিয়া পরিচালনার মতো যথেষ্ঠ টাকা ছিলো না তার পরিবারে। তার বইয়ের প্রকাশকের সহায়তায় সেটা সমাধা হয়েছিল। জয়েসের কথা বলার কারণ হলো শিল্পীদের দেদালাসের মতো এমন অর্জন বিসর্জনের এমন সহবাসের মধ্য দিয়েই যেতে হয়। কোন অর্জনই যেন সম্পূর্ণ অর্জন নয়, পেছনে অনেক বিসর্জনের কাহিনীও থাকে। আবীরের গল্পে গ্রীক মিথের দেদালাসের ছবিই পাই। একজন স্ট্রাগলিং লেখকের স্ট্রাগল শৈল্পিক রূপ নিয়েছে ইকারাসের ডানার মতো। গল্পে আয়াজ আলী ও তার মেয়ের যুগল উপস্থিতি ইকারাস-দেদালাসের যুগলবন্দিকে মনে করিয়ে দেবেই। গল্পটির সবচেয়ে শক্তিশালী উক্তি মনে হয়েছে- “দুনিয়ায় হকলডি মানুষ বাঁচে না, সবাই মরার মত কইরাই বাঁচে। তয় আপনে বাঁচছেন স্যার, বাঁচার মত কইরাই বাঁচছেন। আপনার জনম সার্থক” গল্পের শেষাংশে আয়াজ আলীর ডানাতে পুরো মানবজাতির ইতিহাস লিখিয়ে নিয়ে অসাধারণ শৈল্পিক ওস্তাদি ফলিয়েছেন লেখক। যেন আয়াজ আলী সমগ্র শিল্পী, সাহিত্যিক, কবির প্রতিমূর্তি আর তার ডানা সবার সৃষ্টিকর্মের সম্মিলনী। “সমগ্র মানবজাতির ইতিহাস লেখা সে ডানার একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে। পবিত্র সে সব আত্মা, যারা পৃথিবীর বুকে মানুষের দুখ দুর্দশা অন্তর দিয়ে অনুভব করেছে, ঘোষণা করেছে তার বিরুদ্ধে নীরব বিপ্লব তাদের গাঁথা সোনালী অক্ষরে খচিত সে ডানায়। নিজেকে আজীবন ব্যার্থ ভাবা নগণ্য গণমানুষের কবিকে এভাবেই মহাকাল স্নেহভরে কোলে তুলে নেয়।”

Related Posts

About The Author

Add Comment