সুখপাঠ্য ঐতিহাসিক উপন্যাস “বাদশাহ নামদার”

 

 

হুমায়ূন আহমেদ ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা কিংবা ইতিহাসের কোন এক অধ্যায়কে কেন্দ্র করে নিজস্ব ভঙ্গিমায় সংলাপ ও ঘটনাপ্রবাহ সাজিয়ে নিরস ইতিহাসকে সুখপাঠ্য করে তোলার ক্ষেত্রে যে পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন, তা এক কথায় অনবদ্য!

 

বাংলা সাহিত্যের গল্পের জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ’র সবগুলো ইতিহাসকেন্দ্রিক উপন্যাস এখনও পড়ার সৌভাগ্য হয়নি। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রাজনৈতিক উপন্যাস “দেয়াল” পড়েছি। সম্প্রতি পড়ে শেষ করলাম মোঘল সম্রাট হুমায়ূনকে নিয়ে রচিত “বাদশাহ নামদার” উপন্যাসটি।

img_20160911_202549

মোঘল সাম্রাজ্য নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন গ্রন্থ পড়েছি। বিভিন্ন সম্রাটের জীবনী পড়েছি। তবে, সম্রাট হুমায়ূনের জীবনী নিয়ে বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের “বাদশাহ নামদার” বই পড়ে মোঘল সাম্রাজ্য ও সমসাময়িক নানা ঘটনার পাশাপাশি ব্যক্তি হুমায়ূন মির্জার নানাবিধ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানতে পেরেছি।

 

বিংশ শতকের শেষভাগ ও একবিংশ শতকের প্রথমভাগে বাংলা কথাসাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ যে নিজস্ব ধারার প্রচলন করেছিলেন এবং অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, “বাদশাহ নামদার” উপন্যাসের সংলাপে আমরা সেই ধারাই দেখতে পাই। ঔপন্যাসিকের স্বাধীনতা কাজে লাগিয়ে উপন্যাসের চরিত্রগুলোর মাধ্যমে নিজস্ব ভঙ্গিমায় সংলাপ বলিয়েছেন লেখক হুমায়ূন আহমেদ।

 

“বাদশাহ নামদার” আপাত দৃষ্টিতে একটি সামান্য উপন্যাস গ্রন্থ হলেও, আমার পঠিত সর্বশ্রেষ্ঠ বইগুলোর একটি মনে হয়েছে! এই উপন্যাসের শুরুতেই আমরা দেখতে পাই হিন্দুস্তানে মোঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর তাঁর পুত্র হুমায়ূন মির্জাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ, তাঁর এই ছেলেটি নিতান্তই অলস, ঘরকুঁনো স্বভাবের। তাঁর যুদ্ধ বিগ্রহ ভাল লাগে না। লোকের সংস্পর্শের চেয়ে একাকীত্বেই তাঁর শান্তি। হুমায়ূন মির্জা কবিতা লিখেন, ছবি আঁকেন, বই পড়েন। হিন্দুস্তানের ভাবী সম্রাটের তো আর এসবে চলবে না!

 

ঘটনা আরেকটু এগুলে দেখা যায়, ইতিহাসখ্যাত সেই ট্র্যাজেডি। হিন্দুস্তানের মহান সম্রাট বাবর নিজের প্রাণের বিনিময়ে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত পুত্র হুমায়ূনের জীবন রক্ষা করে পিতা-পুত্রের সম্পর্কের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

 

বাবরের মৃত্যুর পর আমরা দেখব এক হেয়ালি সম্রাট হুমায়ূনকে। সাহিত্যানুরাগী, সংস্কৃতিমনা, বইপোকা, চিত্রশিল্পী, ক্ষমাশীল, ন্যায়পরায়ণ এক সম্রাটের নাম হুমায়ূন। ইতিহাস বলে সম্রাট হুমায়ূনের রাজত্বকাল সুখময় ছিল না। আপন ভাইদের উপর্যুপরি বিদ্রোহ, শের শাহের আক্রমণ ইত্যাদি কারণে জীবনের বেশীরভাগ সময় কাটিয়েছেন যুদ্ধক্ষেত্রে। কিন্তু, এমন বিপদসঙ্কুল জীবনে আমরা দেখি অন্য এক হুমায়ূনকে। প্রধান সেনাপতি বৈরাম খানের হাতে দায়িত্ব দিয়ে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে বসে কবিতা রচনা করছেন, ছবি আঁকছেন, বই পড়ছেন! কী আশ্চর্য!

 

এই উপন্যাসে হুমায়ূনের সেনাপতি বৈরাম খাঁ একটি উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। এছাড়া আফগান শাসক শের শাহ, হুমায়ূন ভ্রাতা কামরান মির্জা, হিন্দাল মির্জা, হুমায়ূন ভগ্নী গুলবদন বেগম, হুমায়ূন পত্নী হামিদা বানু (সম্রাট আকবরের মাতা) প্রমুখ চরিত্রগুলো প্রধান।

 

এই উপন্যাস পড়ে তৎকালীন ভারতবর্ষের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা লাভের পাশাপাশি কূটনৈতিক রাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কে আঁচ করা যায়।

 

সুতরাং, সার্বিকভাবে “বাদশাহ নামদার” বইখানা একটি সুখপাঠ্য হুমায়ূন সাহিত্যকর্ম হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে।

Related Posts

About The Author

Add Comment