সুচিত্রা সেন কেন নিভৃতচারী হলেন ও তার বিবিধ গল্প

বাংলার গর্ব সুচিত্রা সেন অন্তরালে চলে যান ১৯৭৮ সালে। সারাজীবন যে একজন সাংবাদিকের সাথে যোগাযোগ রাখেন তিনি গোপাল কৃষ্ণ রায়। তিনি সংবাদসংস্থা ইউএনআই তে কাজ করতেন। তিনি সুচিত্রা সেনকে নিয়ে বাংলায় তিনটি বই লিখেন। কিন্তু তিনি সুচিত্রার নিভৃতচারী হওয়ার পেছনে শুধু একটা কারণই বলতে পেরেছেন। সুচিত্রা কোন সরাসরি জবাব দেননি সাংবাদিক গোপালের কাছে।

তারপরও গোপাল কৃষ্ণ কিছু শক্ত কারণ তুলে আনতে পেরেছেন বলে মনে করা যায়। ১৯৭৮ সালে সুচিত্রা ও সৌমিত্র অভিনিত ‘প্রণয় পাশা’ নামে একটি সিনেমা মুক্তি পায় তবে এটি মারাত্মকভাবে ফ্লপ করে। এতে সুচিত্রা খুবই হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি কলকাতার অদূরে রামকৃষ্ণ মিশন এর সদরদপ্তর বালুর মাঠে যান। ওখানকার একজন সাধু পুরুষ ভারত মহারাজের সাথে দীর্ঘ সময় নিয়ে কথা বলেন।

গোপাল কৃষ্ণ বলেন “আমি পরে শুনেছিলাম তিনি ঐ সাধু পুরুষটির পায়ে পড়ে অনেক কেঁদেছিলেন।” ভারত মহারাজ সুচিত্রাকে বলেছিলেন-“মা, লোভ করো না।” আমার মনে হয় তিনি এ কথাটিকেই নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করেছেন নিভৃতচারী হয়ে।

“১৯৭৮ সাল থেকে নিভৃতচারী জীবন কাটিয়ে আসা সুচিত্রা কি একাকী ছিলেন? লাইমলাইট থেকে লুকিয়ে যাওয়ার পর থেকে তার জীবনটা কেমন ছিল? অনেকেই অনেক ধারণা করে থাকে তবে তিনি একদিন আমার কাছে বলেছিলেন: “I may be lonely but I am not alone”

তিনি বাংলার এই শ্রেষ্ঠ নায়িকার চরিত্রের আরেকটি বৈশিষ্ঠ তুলে ধরেছেন যেটা হলো তার হাস্যরস। গোপাল কৃষ্ণ অনেকগুলো গল্প তুলে ধরে বলেন- “তিনি ছিলেন খুবই আমুদে।”

একবার সুচিত্রা গোপালকে বলেন তিনি একজন ইউরোলজিস্টের সাথে দেখা করতে চান। গোপাল কলকাতার সেরা ইউরোলজিস্টকে তার বাড়িতে পাঠান। ডাক্তার তাকে দেখে চলে যাওয়ার পর সুচিত্রা গোপালকে জানান, “জানো, তোমার ডাক্তার আমার হাত ধরে রেখেছিল কমপক্ষে ১০ মিনিট!” গোপাল উত্তর দিয়েছিল, “সে আপনার পাল্স চেক করছিল হয়তো।” এ জবাব শুনে তিনি হাসিতে ফেটে পড়ে বলেন, “আমিই তো পাল্স চেক করতে পারি। তিনি শুধু আমার পাল্স চেক করছিলেন না।”

আরেকবার সুচিত্রা সেন গোপাল কৃষ্ণের সাথে একজন গাইনোকলজিস্টের সাথে দেখা করতে তার চেম্বারে যান। তিনি তার মাথা ঢেকে রেখেছিলেন কিন্তু ওখানকার রোগীরা তাকে চিনে ফেলে। এজন্য গোপাল ডাক্তারের সাথে কথা বলেন এবং যত তারাতারি সম্ভব তার সাথে যাওয়া রোগীকে দেখতে বলেন। ডাক্তার তার কথা মান্য করলো। ডাক্তার দেখানো শেষ করার পর তারা বাসায় ফিরছিলেন। সুচিত্রা তখন তার পিচ্চি মুনমুন সেনকে কোলে নিয়ে বলেন, “গোপাল, জানো ডাক্তার কি বলেছে? ডাক্তার আমাকে বললো আমি নাকি…” তারপর তিনি থেমে গেলেন। আমি খুব উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলাম “কি বলেছে, কি বলেছে? সুচিত্রা সেন হাসলেন এবং বললেন… ডাক্তার বললেন আমি নাকি এখনো ভার্জিন/কুমারী।”

গোপাল খুব দু:খ করে বলেন, “তিনি ছিলেন খুবই আমুদে। এখন আর কেউ রইলো না।”

আর যে দুটো গল্প গোপাল মনে রেখেছে ওগুলোও বলতে হবে। যখন বসন্ত শেঠী তথ্যমন্ত্রী ছিলেন তখন সিনেমাতে প্রকাশ্যে চুম্বন দৃশ্য দেখানো যাবে কিনা এটা নিয়ে বিতর্ক উঠেছিল। এটা নিয়ে সাংবাদিক গোপাল কৃষ্ণ একটি প্রতিবেদন লেখতে চাচ্ছিলেন। এজন্য ১০টি প্রশ্ন তৈরি করে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সুচিত্রা সেন সহ আরও কয়েকজন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের কাছে পাঠান। সাথে সাথেই জবাব পাঠিয়ে দেন সুচিত্রা সেন ছাড়া প্রায় সবাই। গোপাল যখন সুচিত্রা সেনকে খুব চাপ দিচ্ছিলেন তখন তিনি তাকে বাসায় যেতে বলেন। তিনি বাসায় যান।

গোপাল স্মরণ করেন, সুচিত্রা সেন হাসলেন এবং বললেন- সত্য কথা হলো ‘চুম্বন এত সহজে দেওয়া যায় না’। তিনি গোপালকে অনুরোধ করলেন যেন তার কথাটি ওখানে লেখা না হয়। তিনি তার অনুরোধ রেখেছিলেন কিন্তু লেখার শেষের দিকে যোগ করে দিয়েছিলেন ‘সুচিত্রা সেন এ নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন’। ঐ প্রতিবেদনটি সব প্রথম সারির দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছিল এবং সুচিত্রা সেনের নজরে পড়েছিল। আবার ডাক পড়লো সাংবাদিক গোপালের।

তিনি ফোনে বলেন, “কই, আমাকে তো বাদ দিতে পারলেনা”। আমি বললাম “দিয়েছি তো”। “কিন্তু লেখার শেষ লাইনটিতে যে আমার নাম ব্যবহার করেছো”। আমি মনে করেছিলাম তিনি খুব রাগ করেছেন। কিন্তু তিনি আমাকে বলেন, “ঠিক আছে, চল আমরা যুদ্ধবিরতি নেই। একদিন চলে আসো এবং আমার সাথে চা খেয়ে যেয়ো।”

সুচিত্রা ও উত্তম কুমারের পর্দার রোমান্টিক সম্পর্ক বাহিরে নিয়ে আসেননি বলে মত দেন গোপাল কৃষ্ণ। তিনি উত্তম কুমারকে নিয়ে বেশি কিছু বলেননি। কিন্তু যেদিন উত্তম কুমার মারা যান ঐদিন সারারাত একেবারে চুপ মেরে ছিলেন এবং পরদিন ভবানিপুর মহানায়কের বাড়িতে গিয়ে ফুলের তোড়ার শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়ে আসেন।

তিনি ও সঞ্জীব কুমারও ভাল বন্ধু ছিলেন। তিনি মুম্বাই গেলে সঞ্জীব কুমারের বাসায় থাকতেন আবার সঞ্জীব কুমারও কলকাতায় আসলে সুচিত্রা সেনের বাড়িতে থাকতেন। বলিউডের “আঁধি” ছবিটি একসাথে করার পর তাদের মধ্যে ভাল বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। সঞ্জীব কুমারের মৃত্যুতেও তিনি খুব কষ্ট পেয়েছিলেন।

সাংবাদিক গোপাল কৃষ্ণ বলেন-“তার জীবনের শেষ সাড়ে তিন দশকে খুব কম লোকই দেখা করতে পারতো। দীলিপ মুখার্জি নামে এক পরিচালক মাঝে মাঝে যেতেন। মৃণাল সেন একবার দেখা করেছিলেন। তার ঘরের দরজা আর সবার জন্য ছিল বন্ধ। তিনি প্রায় প্রত্যেকদিনই আমাকে ডাকতেন। তিনি আমাকে তার সাথে সন্ধ্যাবেলায় হাঁটতে জুড়াজুড়ি করতেন। আমি বলতাম, “মানুষ তো আপনাকে চিনে ফেলবে”, কিন্তু তিনি বলতেন “আরে লেট আস গো না?”

সেন অনেক মুডি ছিলেন এবং অনেক খেয়ালিপনাও ছিল। এমন একটা উদাহরণ দিতে গিয়ে ঐ সাংবাদিক বলেন “কয়েকবছর আগ পর্যন্তও তিনি একটা স্থানীয় দর্জির দোকানে থামতেন। তিনি ওখানে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটাতেন এবং দর্জি ও তার পরিবার নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করতেন।”

আরেকটি গল্প এমন-একদিন খুব জরুরি বার্তা আসে মহানায়িকার কাছ থেকে যে তাড়াতাড়ি তার বাসায় যেতে। “যখন তার বাসায় পৌছলাম তিনি বললেন ‘আমার ওজন মাপা খুব জরুরি, এখনি আমার ওজন মাপতে হবে, চল।’ তারা গাড়ি নিয়ে পাশের নার্সিং হোমটিতে গেলেন। কিন্তু তার ওজন মাপার যন্ত্রটি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তারপর তিনি জোর করে তিন কিলোমিটার দূরে গারিয়াহাট এলাকাতে নিয়ে যান। কিন্তু ওখানকার দোকানগুলোও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সুচিত্রা সেন জেদ করলেন যে ওজন না মেপে ঘরে ফিরবেন না।

“তারপর আমরা আট কিলোমিটার দূরে সেন্ট্রাল কলকাতার গ্রান্ড হোটেলে যাই যেখানে একটি ওজন মাপার যন্ত্র ছিল। যখন ওজন মাপা শেষ হয় তিনি খুব খুশি হন। কাজ শেষ হওয়ার পর তিনি বাহিরে ঘুরাঘুরির আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং সাথে সাথেই বাসায় চলে আসেন।”

আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে সৌভাগ্যবান সাংবাদিক সাহেব বলেন, “একবার সুচিত্রা সেন তাকে লাভারস লেনে দেখা করতে বলেন। আমি তাকে বলেছিলাম-‘আমি জায়গাটা চিনি না’। তিনি খুব দুষ্টুমির সুরে বলেন-“তুমি কেমন সাংবাদিক লাভারস লেন কোথায় জানোনা?” “যখন আমি ওখানে যাই দেখলাম দুই নাতনী রিয়া ও রাইমা সেনকে নিয়ে খুব খুশি খুশি মনে বসে আছে আর বাদাম খাচ্ছে। অবশ্য ভালো করে ঘোমটা দিয়ে আছেন।”

এই দীর্ঘদিনের সঙ্গীর মতে সুচিত্রার যাদু আসলে তার হাসির মাঝে, “আপনি কি জানেন, পর্দায় কান্নার দৃশ্যে তিনি কখনো গ্লিসারিন ব্যবহার করতে হয়নি। যখনই তাকে এমন দৃশ্যের কথা বলা হতো তিনি এক মিনিট সময় নিতেন এবং তার চোখ বন্ধ করতেন এবং দেখা যেত চোখ দিয়ে গড়িয়ে পানি পড়ছে।”

গোপাল কৃষ্ণ রায় ‘সুচিত্রার কথা’ ও ‘অন্য এক সুচিত্রার কথা’ বইয়ের লেখক। ‘সুচিত্রার কথা’ ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত হয়। এখন এটার দ্বাদশ সংস্করণ বাজারে আছে।

সবশেষে বলা যায় অনেকেরই কাছে তিনি খুবই উদ্ধত ও চাপা স্বভাবের। গোপাল কৃষ্ণের মতে আসলে তিনি এমনটিই ছিলেন তবে সব সময়ের জন্য নয়। “এক সন্ধ্যায় তার সাথে বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে হাঁটতে গিয়েছিলাম। তখন ৯.৩০ বাজে। ঐ সময়টাতেই তিনি সাধারণত হাঁটতে বের হতেন। হঠাৎ এক ভদ্রলোক আমাদেরকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় তাকে চিনে ফেলেন। ভদ্রলোকটি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং অটোগ্রাফ চেয়ে বসলেন। আমি বুঝতে পারছিলাম না সুচিত্রা সেন কিভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন। কিন্তু তিনি হাসলেন এবং বললেন, ‘ঠিক আছে, কাগজ ও কলম দেন।’

গোপাল বলেন “লোকটা বললো তার কাগজ ও কলম কোনটাই নেই। তিনি আমার দিকে ফিরেন। আমি বললাম আমার কাছে কলম আছে কিন্তু কাগজ নেই। তখন সুচিত্রা বাঁকা হয়ে রাস্তা থেকে একটা খালি সিগারেটের প্যাকেট তুলেন। এটাকে ছিড়ে ফেলেন তারপর এর পরিস্কার অংশটিতে অটোগ্রাফ দেন।” এ ঘটনাটি যেমন ঐ সৌভাগ্যবান ভদ্রলোকটিকে অবাক করেছিলো তেমনি গোপালকেও অবাক করে দিয়েছিল।

আসলেই লোকটা কি সৌভাগ্যবানই না ছিল! সুচিত্রা সেন তাকে সিগারেটের প্যাকেটে অটোগ্রাফ দিয়েছিল। এটাও এক অসাধারণ গল্পও বটে। প্রকাশ্যে না থেকেও সবসময় আলোচনায় থাকার মত এমন চরিত্র আর একটাও পাওয়া যাবে না এই উপমহাদেশে। রূপালী পর্দার রূপালী জীবনের মত তার অন্তরালের জীবনও ভক্তকুলকে টেনেছে একইভাবে। এবং তাকে নিয়ে আগ্রহ, হতাশা, ভালবাসা, প্রশ্ন, জিজ্ঞাসার শেষ হবে মনে হয় না। তিনি সব যুগেই সিনেমামোদিদের মনে এক চিরযৌবনা রূপেই হাজির হবেন। যেমনটা ছিলেন আমাদের দাদাদের যুগে, বাবাদের যুগে এবং আমাদের যুগে। তিনি যুগ যুগ বাঁচবেন আলোচনায়, সমালোচনায়, কল্পনায়, ভালবাসায়, প্রেমে, জ্যোতিষি না হয়েও যে ভবিষ্যৎ বাণী দেওয়া যায় নির্দ্বিধায়।

 

সাবিদিন ইব্রাহিম

তথ্যসূত্র:

  1. ১৭ জানুয়ারি, ২০১৪ এনডিটিভি তে প্রকাশিত মনিদীপা ব্যানার্জির প্রবন্ধ
  2. ওয়ান ইন্ডিয়ার বিশেষ ফিচার

 

Related Posts

About The Author

One Response

Add Comment