সেনেকার ‘অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ’: পাঠানুভূতি

-তানিম ইশতিয়াক

সাবিদিন ইব্রাহিমের অনুবাদে রোমান দার্শনিক সেনেকার ‘অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ’ পড়ে শেষ করলাম। বহুদিন পরে পড়া আত্মানুসন্ধানমূলক অসাধারণ একটি বই এটি। জীবনকে অর্থপূর্ণ যাপন করা নিয়ে অতি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর ও অনেক অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকের উপর আলো ফেলার চক্রাকার চেষ্টা করেছেন সেনেকা। সেই প্রায়শ প্রশ্ন ও ধূসর ধারাভাষ্য এই যে, ‘জীবন এত ছোট কেন?’ এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানে অনেক সম্পূরক প্রশ্ন আসে। আমরা যে জীবনকাল পাই, তা কি আসলেই ছোট? কোন জীবনকে বড় বলে? দীর্ঘকাল ধরে বেঁচে থাকলেই সেটা কি বড় জীবন হয়? আর যাপিত জীবন কতটা নিজের? আমাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড কতটা নিজের জন্য? এসব বহুল কাঙ্খিত বিবিধ ভাবনার বৃত্তাকার ব্যবচ্ছেদ করেছেন এই প্রভাবশালী রোমান দার্শনিক।

অনূদিত এই বইটির শুরুতে দীর্ঘ ভূমিকা লিখেছেন অনুবাদক। ঝরঝরে সেই ভূমিকাকে বলতে পারি মূল বইয়ের সহজ সংক্ষেপ ও স্বচ্ছন্দ সম্ভোগ। বইটির মূল ভাবনা বলা যায় দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে আছে, জীবনকে গতানুগতিক ব্যয় করার অর্থ ও তাৎপর্য খতিয়ে দেখা। আর দ্বিতীয় ভাগে জীবনকে ফলবান ও মহিয়ান করে উপভোগ করার উপায়। সেনেকা স্বীকার করতে চান না যে, মানুষকে ছোট জীবন দেওয়া হয়েছে। মানুষ তার একজীবনে যতটা সময় পায়, তার বড় অংশটাই ব্যয় করে বেহুদা কাজে। আরেকটা অংশ ব্যয় করে অন্যের প্রয়োজনে। মানুষ আসলে নিজেকে সময় দেয় না, নিজের জন্য নিজের মতো বাঁচতে পারে না অথবা বাঁচতে জানে না। তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, নিজের মালিকানার সামান্য জায়গা জমির মতো বস্তুর কিয়দাংশ অন্য নিতে চাইলে কীভাবে ক্ষেপে উঠি, অথচ সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ সময়কে দেদারসে যাকে তাকে বিলিয়ে দেই। অনুবাদকের ভাষায় বলি, ‘অন্যকে সুখী করতে, অন্যের সামনে সুখী হিসেবে নিজেকে সবসময় তুলে ধরতে কত মানুষের জীবনের বড় অংশ চলে যায়। জীবনের যোগ-বিয়োগ শেষে দেখা যায়, আর সবাইকে সুখী করতে পারলেও যাকে সুখী করা হয়নি সেটা হলো নিজেকে। অনেক মানুষের উপর ক্ষমতাবান হওয়াকে অনেকে জীবনের সফলতা মনে করে। এর একটা গোলকধাঁধা হচ্ছে, এই যে অনেকের কাছে পরিচিত হলেও দেখা যায় যে সে নিজের কাছে সবচেয়ে অপরিচিত। এজন্য অনেক খ্যাতিমান লোক দিনশেষে খেয়াল করে ভড়কে যায় যে, নিজের জন্য তার সময় বরাদ্দ কত কম।’ অনেককেই বলতে দেখা যায়, কবে এসব ছেড়ে অবসরে যেতে পারব। আর অবসরে গিয়েই নিজের স্বপ্নের ও সবচেয়ে আকাঙ্খার কাজ করব। সেনেকা স্মরণ করিয়ে দেন সেই অমোঘ সত্য, শেষ বয়সের অবসর সময় পর্যন্ত ওই মানুষটি বাঁচবে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই!

সেনেকার সমীকরণ পড়তে শুরু করে এক জায়গায় গিয়ে আমি চমকে উঠি! সেখানে তিনি শতায়ু বুড়োদের ডেকে বলতে চান, একটু হিসাব করে দেখো তো, জীবনের কত সময় কত দিকে কত জন নিয়ে গেল! সেনেকার ভাষায়, ‘স্মৃতির দিকে মুখ ফেরাও। দেখো কোন সময়টাতে তোমার নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল। কোন দিনগুলো তোমার পরিকল্পনামতো কাটাতে পেরেছো, কোন সময়টার উপর তোমার নিজের নিয়ন্ত্রণ ছিল, কোন সময়টাতে তোমার মুখমণ্ডল প্রসন্ন ছিল, কোন সময়টাতে তুমি অবিচল ছিলে? … কতটুকু সময় উড়িয়ে দিয়েছো অহেতুক দুঃখবিলাস করে, বোকাদের মতো আনন্দবিলাস করে, লোভাতুর আকাঙ্খা নিয়ে, সমাজের প্রলোভনে পড়ে?’

আমার চমকে ওঠার কারণ হলো, নিজের জীবন নিয়ে ঠিক এমনই একটি পর্যালোচনা আমি করেছিলাম অর্ধযুগ আগে। ২০১২ সালে ‘সময়ের সাতকাহন’ নামে একটি নিবন্ধে আমি লিখেছিলাম, “কতটা ভালো সময়ের ভেতর দিয়ে আমি গিয়েছি? কতটা খারাপ সময়ের মুখোমুখি আমি হয়েছি? কিছুটা সময় আমি আকাশ ছিলাম, কিছুটা সময় সংকীর্ণ। কতক সময়ে আমি বাগান হয়েছিলাম, কাঁঠালচাপার ঘ্রাণ ছেড়েছিলাম। আবার কতক সময়ে আমি নর্দমা হয়েছি, দুর্গন্ধের প্রতীক হয়েছি, হিংসা-ক্রোধ-রাগের বাষ্প ছড়িয়েছি। কিছু সময় ছিল চিন্তার, ভাবনার, পরিকল্পনার। কিছুটা আবেগের, কিছুটা স্বেচ্ছাচারের। কিছুটা ভালোবাসার, কিছুটা অভিনয়ের। সময়ের একটা অংশে আমার জীবনে জোনাকি উড়েছিল, তারকা জ্বলেছিল। কখনো কখনো আমি নিজেই জোনাকি হয়েছি, আলো জ্বেলেছি, সময়কে উজ্জ্বল করেছি। এটা করতে আমার কষ্ট হয়েছিল, পরিশ্রম হয়েছিল, বেদনার বাতাসে তবু মাখামাখি করেছিল জোছনা। কোনো কোনো সময়ে আমার মনে মেঘ জমেছিল, আঁঁধার এসেছিল, রাত্রি নেমেছিল, ঝড় উঠেছিল, বন্যা হয়েছিল। আমি নিজেই মেঘ হয়েছি। মেঘ হয়ে ভেসেছি। উড়েছি। রঙিন ঘুড়ির মতো উড়েছি। কোমলতার সন্ধানে ঘুরেছি। উড়েছি আর ভেসেছি। ভাসতে ভাসতে ঝরেছি, কেঁদেছি। সমস্তই আমার সুখ ছিল, সমস্তই আমার অসুখ ছিল। হেসেছি, কেঁদেছি; কেঁপেছি, ভেঙেছি; শিহরিত হয়েছি, নির্বিকার থেকেছি; উল্লসিত হয়েছি, বিমর্ষ হয়েছি; ঝলসে উঠেছি, মুষড়ে পড়েছি, নিজেকে হারিয়েছি, নিজেকে খুঁজেছি। সময়কে ভেঙে ভেঙে, কেটে কেটে, সাঁতরাতে সাঁতরাতে আমি এগিয়েছি। আমাকে ভেঙেছি, ভাঙতে ভাঙতে গড়েছি; আমি ধ্বংস হয়েছি, ধ্বংসের ভেতর থেকে নতুন আমি বের হয়েছি।”

প্রাসঙ্গিকভাবে বলে রাখি এই পর্যালোচনা আমার ভেতরে তৈরি হয়েছিল, পবিত্র কুরআনের সূরা আসর (সময়) পড়ে। সেখানে আল্লাহ বলছেন, ‘সময়ের কসম! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।’ সেনেকা যেমন সময়কে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ বলেছেন, এই সূরার তাফসিরে ইমাম রাযী সময়কে মানুষের মূলধন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই পর্যায়ে একজন মনীষীর উক্তি উদ্ধৃত করে তিনি বলেছেন : “একজন বরফওয়ালার কাছে থেকে আমি সূরা আসরের অর্থ বুঝেছি। সে বাজারে জোর গলায় হেঁকে চলছিল, ‘দয়া করো এমন এক ব্যক্তির প্রতি যার পূঁজি গলে যাচ্ছে। দয়া করো এমন এক ব্যক্তির প্রতি যার পূঁজি গলে যাচ্ছে।’ মানুষকে যে আয়ুষ্কাল দেয়া হয়েছে তা বরফ হয়ে যাবার মতো দ্রুত অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে । একে যদি নষ্ট করে ফেলা হয় অথবা ভুল কাজে ব্যয় করা হয় তাহলে সেটিই মানুষের জন্য ক্ষতি।

সেনেকা যেসব সমীকরণ মেলাতে বলেছেন, সেই উপলব্ধি আমাদের অনেকেরই হয়। বেশিরভাগেরই হয় শেষ বয়সে, যখন আর শোধরানোর সময় থাকে না। কিন্তু শুরুর দিকেই সেই হিসাব মাথায় থাকলেও আমরা কি নিজের মতো সবকিছু করতে পারি? সেই কৈফিয়ত আমি তখন লিখেছিলাম এভাবে, “নাগরিক জীবনে সময় পাই না সময়কে দেখার। এখানে সময়ের সাথে আকাশের সম্পর্ক নেই, সূর্যের সংস্রব নেই, চাঁদের যোগসূত্র নেই, ঢেউয়ের ছোঁয়া নেই। সময় ঘড়িতে, মোবাইলে, কম্পিউটারে, যন্ত্রে। যন্ত্রের মতো সময় তাই কাঠখোট্টা। সময় আমাকেও নির্জীব করে তোলে, যান্ত্রিক হতে বলে, নীরস হবার মন্ত্র দেয়। আমাকে ছুটতে হয়, চলতে হয়, স্বপ্নের ভেতরেও দৌড়াতে হয়। হাই, হ্যালো, ভালো আছি, কৃত্রিম হাসি, অনুতাপহীন স্যরি, ক্লাস, লেকচার, নোট, পরীক্ষা, অফিস, ঘুম, এলার্ম, দৌড়… আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি। নিজেকে আমার অভিনেতা লাগে। আমি সময়োপযোগী নিপুণ অভিনয় করে যাচ্ছি। সময় আমাকে অভিনয় শেখাচ্ছে। কিংবা কে জানে, সময় নিজেই বড় অভিনেত্রী! কিন্তু এভাবে আমি পরি না। আমি ভেঙে পড়ি। আমার ভেতরে ক্ষরণ হয়। সময় আমাকে ক্লান্ত করে, আমি হাঁপিয়ে উঠি, পিছনে পড়ে যাই। আমি জানি- ‘সময় গেলে সাধন হবে না।’ কিন্তু আমার নিজের জন্য এক টুকরো সময় থাকে না। অথচ আমার একটু সময় চাই। একান্ত মুহূর্ত চাই। খুব ব্যক্তিগত ‘জিরো আওয়ার’ চাই। আমি একটু জানালার পাশে বসতে চাই। আকাশের দিকে তাকিয়ে সময়কে ছুঁতে চাই। নক্ষত্রের সাথে হাঁটতে চাই। বাতাস মাখতে চাই, জোছনায় ভিজতে চাই, কুয়াশায় জড়াতে চাই। সময় আমাকে সেইটুকু সময় দিতে চায় না। সময় আমাকে দূরে ঠেলে দেয়, আবার সময়ই কাছে না আসার কৈফিয়ত চায়! সময় আমাকে খুব অসময়ে আঘাত করে, নিষ্ঠুরভাবে আহত করে। আমি চিৎকার করতে পারি না, চিৎকার করার সময় পাই না।” আসলে আমাদের আর্থসামাজিক বাস্তবতা নিজেদের পছন্দের কাজে মগ্ন হতে দেয় না।

এখন সময়কে কাজে লাগাবো কীভাবে?

সেনেকা একটা গুরুত্বপূর্ণ উপায় বাতলে দিচ্ছেন। তা হচ্ছে, জ্ঞানের পুরোহিতদের বন্ধু বানানো। তাদের কাছ থেকে উপদেশ গ্রহণ করা। সঙ্গী হিসেবে যদি জেনো, পিথাগোরাস, ডেমোক্রিটাস, অ্যারিস্টটল, থিওফ্রাসটোসকে গ্রহণ করি, তবে তাদের কাছ থেকে আমরা শূন্য হাতে ফিরব না। এসব ব্যক্তিদের সঙ্গে দিন রাতের যেকোনো সময় যেকেউ দেখা করতে পারে, তাদের উপদেশ গ্রহণ করতে পারে। সেনেকার ভাষায়, আমাদের ভাগ্যে কোন বাবা-মা পড়বে, সেটা আমাদের ক্ষমতার মধ্যে নেই। আমরা দৈবক্রমে এটা লাভ করি। তারপরও আমরা কাদের সন্তান হতে চাই, সেটা কিন্তু আমাদের হাতে। আমরা চাইলে মহান চিন্তকদের চিন্তার উত্তরসূরী হতে পারি। তাদের যেকারো সন্তান হতে পারি। আমরা শুধু তাদের নামেরই উত্তরসূরী হবো না, বরং তাদের সম্পদেরও ভাগিদার হবো। সেই সম্পদ আমাদের নীচভাবে প্রহরা দিয়ে রাখতে হবে না। যত মানুষকে বিলিয়ে দেব, ততই বৃদ্ধি পাবে। এটা অমরত্বের পথ খুলে দেবে।”

সেনেকার মতে, অন্য মানুষের প্রয়োজনে, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে কিংবা সমাজসেবার চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, নিজেকে সময় দেওয়া। নিজেকে জানা। জীবনের ভাবাবেগের শিকল থেকে মুক্ত হয়ে জীবন ও মৃত্যুর অর্থ খোঁজার চেষ্টা করা। যা কিছু ভালো জানার আছে, করার আছে এই জীবনেই করতে হবে। এই জীবনেই মহৎগুণ ও ভালোবাসার চর্চা করতে হবে। সেনেকা মোটা দাগে যেসব প্রশ্নের উল্লেখ করেছেন তা এই যে, ‘বিশ্বের সারবত্তা কী? আনন্দ কী? জীবন কীভাবে চালাতে হয়, ঈশ্বরের স্বরূপ কেমন, আত্মার জন্য কী পরিণতি অপেক্ষা করছে? দৈহিক বাঁধন থেকে মুক্তির পর আমাদের আত্মা কোথায় যায়…।

সত্যি কথা হচ্ছে, জীবনের শুরুতে এসব প্রশ্নের উত্তর জানা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এসব ভাবনার উপরেই নির্ভর করছে, আমার জীবনটা কোন পথে পরিচালিত হবে। জীবনের মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে, এই দুনিয়াটা আসলে কী? এখানে মানুষের মর্যাদা কী? দুনিয়াকে মানুষ কীভাবে ভোগ ব্যবহার করবে? কোন চরম উদ্দেশ্যের পেছনে মানুষ ছুটছে?

যদি এই মিমাংসায় আসি যে, এই জীবনটাই শেষ জীবন, মৃত্যুর পরে আর কোনো জীবন নেই। তবে ভোগবাদকে জীবনের একমাত্র অবলম্বন মনে করায় দোষ দেখি না। আমার যেভাবে ভালো লাগে, সেভাবেই আমার জীবনকে ব্যয় করতে পারি। আমার লক্ষ্য হতে পারে, প্রচুর অর্থবিত্ত কামানো আর তা ভোগ করা। আমার সুখ হতে পারে ব্যাপক জনপ্রিয় হওয়ার মধ্য দিয়ে। আমার আনন্দ হতে পারে প্রচুর ক্ষমতা চর্চার মধ্য দিয়ে। আবার হতে পারে অন্যের প্রয়োজনে বিলিয়ে দেয়াই সুখ, সমাজসেবায় অবদান রাখাই মুখ্য, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করা মহত্ত্বর। এর কোনোটাতেই সমস্যা হবে না। শুধু নিজের স্বাচ্ছন্দ কোথায় খুঁজে বের করতে হবে। আর তা করতে গিয়ে এই অ্যারিস্টটল, প্লেটো, পিথাগোরাসদের সঙ্গে সময় কাটানোটা বোরিং মনে হতে পারে, তাদের তত্ত্বীয় ভাববাদ পড়াটা বিরক্তিকর ঠেকতে পারে, জ্ঞানচর্চাটা নীরস ও পানসে হতে পারে, এমন জীবন কাটানো অর্থহীন অপচয়ও মনে হতে পারে। এতেও কোনো দোষ দেখি না। এই ক্ষেত্রে কোন জীবনটা অর্থপূর্ণ ও মহৎ- তা ব্যক্তির অভিরুচি ও উদ্দেশ্য ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। তখন সেনেকা বা আমরা কেউই বলতে পারব না, মদে ডুবে থাকা ব্যক্তির জীবন ব্যর্থ হয়েছে, ক্ষমতাধর ব্যক্তির জীবনটা অপচয় হয়েছে!

সেনেকার এই বইটা ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে সূরা আসরকে উপলব্ধি করার আরেকটা চমৎকার আলোচনা মনে হয়েছে। আমার সৌভাগ্য যে, আমি বেশ আগেভাগেই মহামানব হযরত মুহাম্মদকে (সা.) আমার শিক্ষক ও বন্ধু বানিয়েছিলাম। আমি যখন তার উপর অবতীর্ণ কুরআন পড়ি, এই দুনিয়ায় মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে চমৎকার আলোচনা পাই। সেখানে বলা হচ্ছে, মানুষ নিজেদের সম্পর্কে সাধারণত দুই রকম ধারণা পোষণ করে। কেউ মনে করে, এই দুনিয়ায় সে-ই সর্বেসর্বা। এই ধারণায় তার মনমস্তিষ্কে অহংকার ও বিদ্রোহ জন্ম নেয়। ফেরাউন শাদ্দাদের মতো সে বলে, মান আশাদ্দু মিন্না কুওয়াতা (আমার চেয়ে শক্তিশালী আর কে?) অথবা (আনা রব্বুকুমুল আ’লা (আমিই তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রভু)। আবার কেউ কেউ পৃথিবীতে নিজেকে সবচেয়ে নীচ সত্তা মনে করে। তাই সে গাছ-পাথর-আগুন-সূর্য যার কাছেই সামান্য শক্তি দেখে, তার কাছে মাথা নত করে। কুরআন এই দুই ধারণাই বাতিল করে বলছে, “আপন তত্ত্বের প্রতি মানুষের লক্ষ্য করা উচিত যে, সে কোন জিনিস থেকে পয়দা হয়েছে? সে পয়দা হয়েছে সবেগে নির্গত এক পানি থেকে যা পিঠ ও বক্ষ অস্থির মাঝখান থেকে বেরিয়ে আসে” (সুরা আততারিক : ৫-৭)। এই বাক্য বলে মানুষের অহংকারকে চূর্ণ করেছেন। আবার তার মর্যাদায় বলেছেন, “আমরা বনী আদমকে সম্মান দান করেছি এবং স্থল ও জল পথে যানবাহনের ব্যবস্থা করেছি এবং আমাদের সৃষ্টি করা বহু জিনিসের ওপর তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি” (সূরা বনী ইসরাঈল-৭০)। “(হে মানুষ!) তুমি কি লক্ষ্য করো না, দুনিয়ায় যা কিছু রয়েছে, আল্লাহ তার সবই তোমাদের জন্যে অধীন করে দিয়েছেন? (সূরা আলহাজ্জ-৬৫)। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা মানুষকে শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে বর্ণনা করে তাকে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন।

এখন ফিরে আসি সূরা আসরে। সময়ের কসম করে বলা হচ্ছে, সেসব মানুষ ক্ষতির মধ্যে নেই, যারা চারটি বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। প্রথমত, যারা সৃষ্টিকর্তা এক আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করেছে, সৎ কাজ করেছে, অন্যকে সৎ উপদেশ দিয়েছে, এবং ধৈর্য ধারণের পরামর্শ দিয়েছে। এই লেখায় ব্যাখ্যা বলার সুযোগ নেই। তবে প্রাসঙ্গিকভাবে এটা বলতে হবে যে, এতে আমার জীবন যাপনটা কেমন হচ্ছে। আমি স্রষ্টায় অনুগত হচ্ছি এবং মানবকল্যাণের অনুভূতি ধারণ করছি, তখন অন্যের কল্যাণে কাজ করা আমার সময় নষ্ট নয়। শান্তিপূর্ণ জনপদ গড়ার জন্য রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন কিংবা সমাজসেবায় আমার জীবন ব্যয় করা মূলত আমার নিজের জন্যই। এমনকী আমার স্ত্রীর মুখে খাবার তুলে দেওয়াও আমার বিনিয়োগ। যাকাত বিধানের এক লেখায় পড়েছিলাম, আমাদের অর্থব্যয় মূলত আল্লাহর পথে। ইয়াতিম, বিধবা, অসহায়, বিপদগ্রস্ত এবং নিসম্বল পথিকদের জন্য যা কিছু দান করি, এর প্রতিদান তাদের কাছে আশা করি না। তাই বলে এটা নিঃস্বার্থও না। এর প্রতিদান আল্লাহ দিবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অতএব সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে বা মানুষের উপকারার্থে আমরা যে সময় ও সম্পদ ব্যয় করি, তা মূলত আমার নিজের জন্যই ব্যয় করি। এই বিনিয়োগের বহুগুণ লাভসমেত আমরা ফেরত পাবো। যখন ঈমানের রঙ মেখে আমি আমার জীবন পরিচালনা করি, নামাজ শেষ হলে জনপদে ছড়িয়ে পড়ি, সৎ কাজ করি, অন্যের উপকার করি, ঝঞ্ঝাগ্রস্ত মানুষকে সততায় অটল থাকতে ধৈর্য ধরতে বলি- এভাবে দিন-রাত ব্যয় করি, এই ২৪ ঘণ্টাই মূলত আমার নিজের জন্য ব্যয় করছি। আমার জীবনের পুরোটাই আমি আমাকেই দিচ্ছি।

বই : অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ

লেখক : লুকিউস আন্নাইউস সেনেকা

অনুবাদ : সাবিদিন ইব্রাহিম

প্রকাশনী : ঐতিহ্য

মূল্য : ১৫০ টাকা

Related Posts

About The Author

Add Comment