সেমিওলজি ও ঈশ্বর – তৃতীয় পর্ব

লেখক, সমালোচক ও ভাষাতাত্ত্বিক শিশির ভট্টাচার্য্যের গুরুত্বপূর্ণ বই ‘ঈশ্বর ধর্ম বিশ্বাস’ এর প্রথম অধ্যায় ‘সেমিওলজি ও ঈশ্বর’ এর  তৃতীয় অংশ নিচে দেওয়া হলো:

রূপক: নূতন সঙ্কেত

ধ্বনি অনেক রকমই সৃষ্টি করতে পারে মানুষ মুখ দিয়ে, কিন্তু সব ধ্বনি ভাষায় ব্যবহার করা যায় না। একটি ভাষায় খুব বেশি হলে শ’খানেক ব্যবহারযোগ্য ধ্বনি থাকতে পারে। এই শ’খানেক ধ্বনি দিয়ে লক্ষ লক্ষ শব্দ তৈরি হয়। আরও বহু লক্ষ শব্দ তৈরি হতে পারে কিন্তু সব ধ্বনির সাথে সব ধ্বনি পাশাপাশি বসতে পারে না সব ভাষায়। এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক ভাষাতেই নাসিক্য ব্যঞ্জনধ্বনি দিয়ে হরহামেশাই শব্দ শুরু হতে পারে। কিন্তু বাংলায় নাসিক্য ব্যঞ্জনধ্বনি দিয়ে কোনো শব্দ শুরু হতে পারে না। শব্দের শুরুতে ‘ঙখলা’ ধ্বনিক্রমটি বাংলায় গ্রহণযোগ্য নয়, যদিও ‘শৃঙ্খলা’য় আপত্তি নেই।

যত দ্যোতকই তৈরি করুক মানুষ, মানব-মস্তিষ্কে দ্যোতিতের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। দ্যোতিতের সংখ্যা বেশি কেন? এর একটি কারণ, পৃথিবীতে বস্তুর সংখ্যা অসীম। দ্বিতীয় কারণ, মানুষের মস্তিষ্ক নামক যন্ত্রে বিশেষ দু’টি মডিউলের উপস্থিতি। এই দু’টি মডিউলের মধ্যে একটির কাজ হবে ক-নামক উপাদান ও খ-নামক উপাদানের মধ্যে যোগ-বিয়োগ করা আর অন্যটির কাজ হবে ক-এর সাথে খ-এর সাদৃশ্য খুঁজে বের করা। প্রথম মডিউলটির নাম হতে পারে ‘কোয়ান্টিফায়ার’ (পরিগণক) মডিউল এবং দ্বিতীয়টির নাম হতে পারে ‘অ্যানালজি’ (যার বাংলা প্রতিশব্দ হতে পারে ‘অনুসার’) মডিউল। কম্পিউটার যেমন বিভিন্ন প্রোগ্রাম অনুসারে কাজ করে তেমনি মানুষের মস্তিষ্কেও বিভিন্ন প্রোগ্রাম রয়েছে। কোনো কোনো ভাষাবিজ্ঞানীর মতে (যাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন নোম চমস্কি) এসব প্রোগ্রাম মানব মস্তিষ্কে জন্মাবধি থাকে। অন্য কিছু পন্ডিতের মতে, জন্মের সময় শিশুর মস্তিষ্ক শুধুই একটি কম্পিউটার। বড় হতে হতে চারপাশের জীবন ও জগতের সাথে মিথস্ক্রিয়া বা ইন্টারঅ্যাকশন করে মস্তিষ্কে প্রোগ্রাম তৈরি হতে থাকে। একটি দু’টি নয়, হাজার রকমের প্রোগ্রাম রয়েছে মানুষসহ যে কোনো প্রাণীর মস্তিষ্কে। এক একটি প্রোগ্রাম এক একটি মডিউলের অংশ।

পরিগণক মডিউলের কাজ বস্তুর সংখ্যা গণনা করা। শুধু মানব মস্তিষ্ক নয়, এর চেয়ে অনেক কম উন্নত যেমন পাখির মস্তিষ্কেও এই পরিগণক মডিউল রয়েছে। যে কোনো পাখি একটি বিস্কিট আর দুইটি বিস্কিটের তফাৎ বোঝে। পরিগণক মডিউলের আবার বিভিন্ন উপমডিউল আছে যার মধ্যে একটির কাজ হচ্ছে যোগ করা: ‘ক’ দ্যোতিতের সাথে ‘খ’, ‘ক+খ’-এর সাথে ‘গ’…. ইত্যাদি। একে আমরা বলতে পারি ‘যোজনা’ উপমডিউল। অ্যানালোজি মডিউলের প্রধান একটি কাজ হচ্ছে কোনো একটি দ্যোতককে কমবেশি সাদৃশ্যপূর্ণ অন্য একটি দ্যোতিতের সঙ্গে য্ক্তু করা। একেবারে আনকোরা, নতুন একটি দ্যোতক সৃষ্টি করার চাইতে এ কাজটি সহজতর। ধরা যাক, একবার আগুনে হাত দিয়ে শিশুর হাত পুড়েছে। শিশু দ্বিতীয় বার আর হাত দেয় না. আগুনের ছবিতেও হাত দিতে চায় না, কারণ, মস্তিষ্কের অনুসার মডিউল শিশুকে বলে: ‘এটা আগুন, হাত দিলে আবার হাত পুড়বে।’ পুড়বেই এমন কোনো কথা নেই, তবুও অনুসার বা অ্যানালোজি মডিউল ধরে নেয়, হাত পুড়বেই যে কোনো আগুনে হাত দিলে, অর্থাৎ অনুসার মডিউল আগুনের দ্যোতিতটাকে আগুনের ছবিসহ আগুনের সব ধরনের দ্যোতকের উপর আরোপ করে।

রূপক শব্দ সৃষ্টিতে এই অনুসার মডিউলের ভূমিকা আছে বলে মনে হয়। ফরাসি ভাষায় যে প্রাণীটির নাম ‘সুরি’ বাংলায় তার নাম ‘নেংটি ইদুর’। বাঙালির ভাষা মানসে ‘নেংটি ইদুর’ এক ধরনের ইঁদুর বই নয়। বাংলায় যে প্রাণীর নাম ‘বাদুড়’ ফরাসিতে তার নাম ‘শোভসুরি’ বা ‘টেকো নেংটি ইদুর’। কিন্তু ফরাসি ভাষা মানুসে ইঁদুর আর নেংটি ইঁদুর দু’টি আলাদা প্রাণী। ‘সুরি’ শব্দে বাদুরের নামগন্ধ নেই। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বাদুড় প্রাণীটিকে ফরাসি ভাষামানস একটি ‘টেকো নেংটি ইঁদুর’ মনে করেছে যেমন করে বাংলা ভাষামানস এক ধরনের ‘সবুজ রঙের লাফিয়ে চলা পোকা’র নাম দিয়েছে ‘সাপমাসী’। ফরাসিতে এই একই পোকার নাম ‘সতরেল’ অর্থাৎ ‘লাফিয়ে চলা ছোট কোনো কিছু’। বাংলা শব্দটিতে পোকাটির স্বভাবের কোনো প্রতিফলন নেই কিন্তু ফরাসি ‘সতরেল’ শব্দে পোকাটির একটি বিশেষ স্বভাব ‘লাফানো’ প্রতিফলিত হয়েছে। এভাবে একটি দ্যোতিতের বৈশিষ্ট্য অন্য একটি দ্যোতিতের উপর আরোপ করে মানব মস্তিষ্কের অনুসার মডিউল নতুন দ্যোতক সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। অনুসার আর যোজনা মডিউলের কারণে একটি দ্যোতিতের সাথে অন্য একটি দ্যোতিত যোগ হয়ে নিত্যনূতন সঙ্কেতের সংখ্যা অবিরাম বেড়ে চলে। সাপ + মাসি = সাপমাসি, শোভ (‘টেকো’) + সুরি (‘নেংটি ইঁদুর’) = শোভসুরি ইত্যাদি।

কবিদের মস্তিষ্কে এই অ্যানালজি মডিউলটি সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি ক্রিয়াশীল থাকে। ‘উপমাই কবিতা’ কথাটি বলেছিলেন হাজার দু’য়েক বছর আগে অ্যারিস্টটল আর ইদানিং কালে বাঙালি কবি জীবনানন্দ। ধরা যাক, কবির মস্তিষ্কে সৃষ্টি হলো এক নতুন দ্যোতিত ‘পাখীর নীড়ের মতো চোখ’। যে চোখে পিচুটি পড়ে বা ছানি পড়ে ঝাপসা হয়ে যায় যে চোখ, সে রকম সাধারণ কোনো ‘চোখ’ নয় এই ‘পাখীর নীড়ের মত চোখ’। অন্য একটি উদাহরণ দেয়া যাক। ‘মাঝি’ এক জিনিষ আর ‘মনমাঝি’ অন্য এক জিনিস। ‘মনমাঝি’ আপনাকে সদরঘাট থেকে জিঞ্জিরায় নিয়ে যেতে পারে না বা পিঞ্জিরার ‘মনপাখি’কে ছোলা খাওয়ানোও সম্ভব নয়। কবিদের এই সব নিত্যনতুন দ্যোতক যখন সাধারণ্যে গৃহীত হয় তখন নতুন দ্যোতক আর এর দ্যোতিতটি ভাষার অংশ হয়ে যায়।

রূপক শব্দেরও পরিবর্তন আছে। পরিবর্তন জীবনের ধর্ম। ভাষা জীবনের অংশ। সুতরাং ভাষাও স্বতঃপরিবর্তনশীল। এক সময় ‘বিদ্যালয়’ ছিল একান্তভাবে ‘বিদ্যার আলয়’। শিক্ষার্থীকে সেই আলয়ে বেশ কিছুক্ষণ বাস করতে হত। তুলনা করুন, ‘যমালয়’, ‘বেশ্যালয়’। প্রথম দিকে ‘বিদ্যালয়’ একটি রূপক শব্দ ছিল, এখন অতি সাধারণ একটি শব্দ। সংস্কৃতে ‘উদার’ শব্দটির অর্থ = দ্যোতিত ছিল ‘বৃহৎ উদর আছে এমন কোনো প্রাণী’ অর্থাৎ ঘোড়া। এটিও রূপক শব্দ এবং নিঃসন্দেহে কোনো না কোনো কবি শব্দটির শিলান্যাস করে থাকবেন সুদূর অতীতে। পরে শব্দটির পরিবর্তিত অর্থ দাঁড়ায়: ‘বৃহৎ হৃদয় আছে এমন কোনো ব্যক্তি’।

কবি যা খুশি কল্পনা করতে পারেন, কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে করেন না। মস্তিষ্কের অনুসার মডিউল অজ্ঞাত কিছু নিয়ম মেনে চলে। কোনো দু’টি ভাষাতেই উপমাসৃষ্টি একভাবে হয় না। ভারতবর্ষে সুন্দরী নারীর মুখের সঙ্গে চাঁদের উপমা দেয়া হয়। এ উপমা ফরাসি সাহিত্যে পুরোপুরি অনুপস্থিত। সাধারণ বাঙালির প্রেমপত্রে ‘ময়নাপাখী’ বা ‘গোলাপ’ প্রেমিকার উপমা, কিন্তু সাধারণ ফরাসি প্রেমিক-প্রেমিকা তাদের বিপরীত সঙ্গীকে সম্বোধন করে ‘মো শু’ (‘ওগো আমার বাঁধাকপি’) বা ‘মো কানার’ (‘ওগো আমার হাঁস’) বা ‘মা বিশ’ (‘ওগো আমার হরিণী’) বলে। বাংলা কবিতায় এ ধরনের উপমা ব্যবহার করা কোনো কবির পক্ষে সম্ভব নয়, যত মৌলিক আর আন্তরিকই সেই কবি হোন না কেন (যদিও ‘হরিণী’ চলতে পারে)। সুতরাং উপমাসৃষ্টির ব্যাপারটিও ভাষার নিয়মের অধীন।

ভাষার পুরো ব্যাপারটাই এক ধরনের মূর্তি নিয়ে খেলা। কোন মূর্তি ঠিক কোন জায়গায় বসবে তা ঠিক করে ভাষার ব্যাকরণ, উল্টাপাল্টা বসিয়েছেন কি মরেছেন। খেলা ভঙ্গ, পূজা প-। পূজাম-পে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীদের হামলাও হয় অনেক সময়। যেমন আনন্দবাজারীরা লেখে: ১ বৈশাখ, ২১ ফেব্রুয়ারি। এটি ছোট খাট একটি হিন্দি-প্রভাবিত হামলা বাংলা ভাষার উপর। অনেক পূজারী নিজের ইচ্ছেমত মূর্তি সাজায়। এক দেবতার পূজার নিয়মে শুরু করেন তারা অন্য দেবতার পূজা। এর উদাহরণ: কবিতায় শ্রী মধুসূদন দত্ত বা গদ্যে কমলকুমার মজুমদার। কমলকুমার ফরাসি বাক্যবিন্যাসে বাংলা শব্দ সাজাতে চেষ্টা করেছেন। মূর্তির নতুন বিন্যাস যদি সবাই কমবেশি মেনে নেয় তবে সেটা হয়ে দাঁড়ায় নতুন স্টাইল। এর ফলে ভাষা সমৃদ্ধ হতে পারে। যদি পূজার নতুন এই পদ্ধতি কেউই মেনে না নেয় তবে তাকে বলা হয় অকারণ বিদ্রোহ। চোরাগোপ্তা হামলা আর অকারণ বিদ্রোহ ভাষা ব্যবহারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।

সিনেমায়ও প্রতিমা ও প্রতীকের ব্যবহার হয়। চ্যাপলিনের ‘মডার্ন টাইমস’ ছবির একটি দৃশ্যে দেখা যায় শ্রমিকেরা কারখানায় ঢুকছে। পরের দৃশ্যে দেখানো হয় এক পাল ভেড়া ঢুকছে খোঁয়ারে। এখানে ভেড়ার পাল শ্রমিকের দলের রূপক। ‘আধুনিক যুগে শ্রমিকের সাথে ভেড়ার কোনো ফারাক নেই’− এই দ্যোতিতটি সৃষ্টি করেছে শ্রমিক ও ভেড়ার দ্যোতকের পর পর ব্যবহার। চলচ্চিত্রের ইংরেজি পরিভাষায় দ্যোতিত সৃষ্টির এই বিশেষ টেকনিকটির নাম ‘মন্তাজ’। চিত্রশিল্পেও প্রতিমা ও প্রতীকের বহু বিচিত্র ব্যবহার লক্ষ্য করা যেতে পারে।

চিহ্নবিজ্ঞান বা সেমিওলজি

প্রতিমা, প্রতীক, সঙ্কেত সহ যাবতীয় চিহ্নের বর্ণনা ও ব্যাকরণ ‘সেমিওলজি’ নামক বিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়। গ্রীক শব্দ ‘সেমেইয়ন’ আর ‘লোগোস’ সমাসবদ্ধ হয়ে এই শব্দটি সৃষ্টি হয়েছে। ‘সেমিওলজি’ শব্দটি ১৭৫২ সাল থেকেই ফরাসি ভাষায় ব্যবহৃত হচ্ছে। তখন সেমিওলজি ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানের অংশ। সে যুগে এর কাজ ছিল, রোগের উপসর্গ দেখে রোগ নির্ণয় করা। উপসর্গগুলো রোগের লক্ষণ বা চিহ্ন। জ্বর হলে যেহেতু গায়ে ব্যথা করে সেহেতু গায়ে ব্যথা ব্যথা করলে ভাবতে হবে জ্বর হয়েছে…. ইত্যাদি। ১৯১০ সালে সুইস ভাষাবিজ্ঞানী Ferdinand de Saussure (১৮৫৭-১৯১৩) এই শব্দটিকে চিহ্ন বিজ্ঞানের প্রতিশব্দ হিসেবে প্রথম ব্যবহার করেন। উত্তর আমেরিকান ঘরানায় এই শাস্ত্রের নাম ‘সেমিওটিকস্’। উত্তর আমেরিকায় সেমিওটিকসের গোড়াপত্তন করেন Charles Sanders Peirce (১৮৩৯-১৯১৪)। সস্যুর আর পার্সের মতে সমাজে চিহ্নসমূহের উদ্ভব, বিকাশ ও বিন্যাস বিচার-বিশ্লেষণ করবে যে শাস্ত্রটি তারই নাম হবে ‘সেমিওলজি’ বা ‘সেমিওটিকস্’। ভাষা চিহ্নের সমষ্টি। সুতরাং একদিক থেকে দেখলে ভাষাবিজ্ঞান সেমিওলজি বা চিহ্নবিজ্ঞানেরই একটি শাখা (ফরাসি সেমিওলগ বা ‘চিহ্নবিজ্ঞানী’ Roland Barthes এই মতই পোষণ করতেন)।

তবে চিহ্নবিজ্ঞান ও ভাষাবিজ্ঞানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য আছে। আগেই বলা হয়েছে সব ধরনের চিহ্ন দিয়ে ভাষা সৃষ্টি হয় না। ভাষা সৃষ্টি করার জন্য প্রয়োজন ‘সঙ্কেত’ জাতীয় চিহ্নের। একাধিক সঙ্কেত একত্রিত হয়ে ভাষা সৃষ্টি হয়। অন্যান্য চিহ্নের সাথে সঙ্কেতের পার্থক্য দু’টি ক্ষেত্রে: ১. সঙ্কেতের ক্ষেত্রে দ্যোতক ও দ্যোতিতের সম্পর্ক আর্বিত্রিক; ২. সব ধরনের চিহ্নেরই পারষ্পরিক অবস্থান বা বিন্যাস (Syntactic) থাকতে পারে কিন্তু সঙ্কেতের ক্ষেত্রে চিহ্নসমূহের বিন্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং ‘সঙ্কেত’ চিহ্ন হলেও এটি বিশেষ এক ধরনের চিহ্ন এবং সঙ্কেতের সমষ্টি যেহেতু ভাষা সেহেতু ভাষাবিজ্ঞানকে সেমিওলজির শাখা না বলে একে স্বতন্ত্র একটি বিজ্ঞান হিসেবে বিবেচনা করার যুক্তিযুক্ত।

বিমূর্ত ধারণা ও ঈশ্বর

‘কলা’ দ্যোতকটির একটি সর্বজনপরিচিত নির্দেশিত আছে। মোটা মোটা আঙুলের মতো হলুদ রঙের এই ফলটি আমরা সবাই চিনি। বাস্তব জগতের একটি ফল হচ্ছে এই কলা। কিন্তু অনেক দ্যোতক যেমন ধরুন, ‘ভালোবাসা’ বা ‘জনগণ’-এর কোনো নির্দেশিত নেই। এসব শব্দের শুধু দ্যোতক ও দ্যোতিত রয়েছে। নির্দেশিত বা রেফারেন্ট নেই এমন শব্দকে বলা হয় বিমূর্ত শব্দ। বিমূর্ত শব্দ নিয়ে হাজারো ঝামেলা। যা আমার জন্য ‘কলা’ তা দুনিয়ার সবার জন্য ‘কলা’। কিন্তু আমি যে অনুভূতিটিকে ‘ভালোবাসা’ বলে মনে করি সেই একই অনুভূতিকে আপনি হয়ত ‘ভালোবাসা’ বলে মনে করেন না।

এ রকম আর একটি বিমূর্ত শব্দ ‘ঈশ্বর’। দেশে দেশে ঈশ্বরের হাজার রকম চেহারা। সমভূমির ঈশ্বর আর মরুভূমির ঈশ্বরের প্রকৃতি এক রকম নয়। ভারতবর্ষের যমুনাতীরের ‘কাউবয়’ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গরুর গায়ে হেলান দিয়ে বাঁশি বাজাতে পারেন পরের বৌ, নিজের গার্লফ্রেন্ড রাধাকে জড়িয়ে ধরে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এ ধরনের ঈশ্বরকে পত্রপাঠ ‘কতল’ করা হবে। ইওরোপীয় দেশগুলোতে এরকম ঈশ্বরের ভিসা পাওয়াই মুশকিল হবে, পূজা পাওয়া তো অনেক দূরের কথা।

ঈশ্বরের রূপ কেমন? ধর্মগুলোর উত্তর: তাকে কল্পনা করা যায় না। তার রূপ কল্পনা করতে গেলে নাকি ‘বাক্যের সহিত মন ফিরিয়া আসে’। ঈশ্বরের রূপ কল্পনা করা না গেলেও তার গুণগুলোর কথা আমরা সবাই জানি। ঈশ্বরে যাঁরা বিশ্বাস করেন তাঁদের মধ্যে খুব কম লোকেরই এ ব্যাপারে সন্দেহ আছে যে ঈশ্বরই মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী সৃষ্টি করেছেন। তিনি ধর্মগ্রন্থসমূহ রচনা করেছেন। তিনি মানুষকে পাপ ও পুণ্যের বোধ দিয়েছেন। পুণ্য করলে মানুষকে তিনি পাঠিয়ে স্বর্গে আর পাপ করলে সোজা নরকে। যখন মানুষের পাপ-পুণ্যের বোধ লোপ পায় তখন (মধ্যপ্রাচ্যে প্রচলিত ধর্মমত অনুসারে) তিনি নবী পাঠিয়ে দেন পৃথিবীতে অথবা (ভারতবর্ষে প্রচলিত হিন্দু ধর্ম অনুসারে) নিজেই চলে আসেন পৃথিবীতে। লক্ষ্য করা যেতে পারে যে এই ‘আসা-যাওয়া’, ‘পাঠানো’-র মতো ঈশ্বরের অনেকগুলো গুণ মানুষেরও আছে। মানুষ আইন রচনা করতে পারে। কোনো মানুষ আইন না মানলে তাকে পাঠানো হয় জেলখানায়। আইন সব সময় মেনে চললে তাকে কোনো পুরস্কার অবশ্য দেয়া হয় না। তবে খুব ভালো কোনো কাজ করলে তাকে পুরস্কার দেয়া হয়: নোবেল, অস্কার, পদ্মশ্রী, একুশে পুরস্কার ইত্যাদি। এ রকম দাবি করা যেতে পারে যে যোজনা উপ মডিউলের প্রভাবে মানুষের বিভিন্ন গুণ যোগ হয়ে মানব মস্তিষ্কে তৈরি হয়েছে ঈশ্বরের রূপক।

ঈশ্বর ধারণায় অ্যানালজি বা অনুসারের প্রভাব লক্ষ্যনীয়। ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান। তিনি সব দেখেন। মানুষের সঙ্গে ঈশ্বরের এটি একটি বড় তফাৎ। মানুষ সব দেখে না। একজন মানুষ যখন মন্ট্রিয়লে আছে তখন সে একই সাথে চট্টগ্রামে থাকতে পারে না। ঈশ্বর কিন্তু পারেন। সুতরাং ‘ঈশ্বর যখন পৃথিবীতে আসেন তখন স্বর্গে কে থাকে?’− এ ধরনের প্রশ্ন করা যাবে না, কারণ তিনি একই সাথে সব জায়গায় থাকতে পারেন। সর্বত্র বিরাজমান হওয়ার গুনটি অভূতপূর্ব মনে হতে পারে মানুষের কাছে, কারণ মানুষের এ গুণটি নেই। কিন্তু যৌক্তিকভাবে চিন্তা করলে এটা অসম্ভব নয়। ‘ক’ যদি এক জায়গায় থাকতে পারে তবে সব জায়গায় থাকতে অসুবিধা নেই, কারণ সব জায়গা হচ্ছে অনেকগুলো এক জায়গার সমষ্টি। মানুষ কোনো নির্দিষ্ট সময়ে শুধু একটি মাত্র স্থানে থাকতে পারে। অতিমানব ঈশ্বর সব জায়গায় থাকতে পারেন।

পৃথিবীর সব ধর্মের প্রধান গ্রন্থে ঈশ্বরের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সব ধর্মগ্রন্থকেই এক সময় ঈশ্বরের বাণী বলে মনে করা হত। এখনও অনেক ধর্মালম্বীর দৃঢ় বিশ্বাস: অন্ততপক্ষে তাদের ধর্মগ্রন্থটি মানব-রচিত হতে পারে না, অন্য ধর্মের গ্রন্থগুলো মানুষের লেখা হলেও হতে পারে। মানুষ কর্তৃক লিখিত হোক না হোক, ধর্মগ্রন্থগুলো মানব ভাষায় লেখা। মানবভাষা মানব মস্তিষ্কের সৃষ্টি। মানব ভাষার নিজস্ব কিছু প্রতিবন্ধ আছে। যেমন, এমন কিছু মানব ভাষায় প্রকাশ করা যায় না যা মানুষ কখনও দেখেনি বা শোনেনি। গ্রীক পুরাণের অশ্বমানব সেন্টরের উত্তমাঙ্গ মানুষের মতো, শরীরের বাকি অংশ ঘোড়ার মতো। ছাগমানবের পায়ে রয়েছে ছাগলের মত খুর। হিন্দুদের দেবতা গণেশের মুখ নেই, আছে হাতির মতো শুঁড়। মহিষাসুর নামক অসুরের মাথা ছিল মহিষের মতো। আগের দিনের মানুষের এসব কল্পনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, মানুষ তার দেখা দু’টি আলাদা প্রাণীকে কল্পনায় জোড়া দিয়েছে। এটা মস্তিষ্কের যোজনা মডিউলের কাজ। মানুষ যখন ‘সোনার পাহাড়’ কল্পনা করে তখন সে নতুন কিছুই সৃষ্টি করে না। সোনাও সব মানুষ চেনে, পাহাড়ও সবাই দেখেছে। সুতরাং ‘সোনার পাহাড়’-এর রূপকটি বুঝতে কোনো মানুষেরই কোনো অসুবিধা হয় না। যে কোনো রূপক কল্পনায় যেমন ধরুন, ‘মনমাঝি’, ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ’ ইত্যাদিতে উপমান ‘মন’, ‘পাখির নীড়’ আর উপমিত ‘মাঝি’, ‘চোখ’ মানুষের পূর্বপরিচিত হতেই হয়। অন্যথায় রূপক সৃষ্টি করা সম্ভব হয় না কোনো কবির পক্ষেই।

আপনারা কি কখনও অন্য গ্রহের প্রাণী ই.টি.’র ছবি দেখেছেন? কিম্ভুতকিমাকার তার চেহারা: লম্বা কান, বামনের মতো আকার, সব মিলিয়ে বিচ্ছিরি ধরনের একটি মানুষ। মানুষ ই.টি.কখনও দেখেনি। ই.টি’র কল্পনা করার সময় মানুষ নিজের শরীরের একটি প্রতিরূপ তৈরি করেছে। কেন এই বিশ্রী প্রতিরূপ? আধুনিক মানুষ হয়তো চায় ব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে সুন্দর প্রাণীটি একমাত্র সে নিজেই হবে। অন্য গ্রহের প্রাণী গুণে বা ক্ষমতায় মানুষকে ছাড়িয়ে গেলেও রূপে মানুষের তুলনায় সব সময় ন্যূন থাকবে, অন্তত মানুষের দৃষ্টিতে। ঈশ্বর প্রসঙ্গে মানুষের কিন্তু এমন কোনো ঈর্ষা নেই। হিন্দু দেবদেবীর মূর্তিই দেখুন বা গ্রীক দেবদেবীর মূর্তিই দেখুন, মানুষের কল্পনায় ঈশ্বরও সাধারণত হয়ে থাকেন সুন্দরতম পুরুষ বা নারী।

ঈশ্বর ও মূর্তিপূজা

পরিগণক মডিউলের কারণে মস্তিষ্ককে গুণতে হয়। গুণতে হলে অবয়ব বা মূর্তি চাই। বিমূর্ত জিনিস গোনা যায় না। ‘পানি’ বস্তুটি গোনা যায় না বলে মানুষ বলে: এক ‘গ্লাস’ পানি বা এক ‘বিন্দু’ জল। এখানে ‘গ্লাস’ আর ‘বিন্দু’ দিয়ে পানিকে অবয়ব দেয়া হলো। দুধের স্বাদ মানুষ ঘোলে মেটায়। নির্দেশিত নেই? কুচ পরোয়া নেই, কল্পনা করো। বানিয়ে নাও মনে মনে বস্তুটিকে। মানব মস্তিষ্ক বিমূর্ত ভাব সহ্য করতে পারে না। গ্রীকরা কল্পনা করেছিল ভালোবাসার এক দেবীকে। আর্য্যরা কল্পনা করেছিল ভালোবাসার দেবতা মদনকে। হাতে তার পঞ্চ শর। এদিক ওদিক ছুঁড়েই চলেছে তীরগুলো আর তাতেই নারীপুরুষ একে অন্যের প্রেমে পড়ছে। আধুনিক কালেও তীরবিদ্ধ তিনকোণা হৃৎপিন্ড ভালোবাসার প্রতীক।

মানুষের ঈশ্বর কল্পনার মূলেও রয়েছে মানবমস্তিষ্কে মূর্তির অত্যাবশ্যকতা। মূর্তি ছাড়া মস্তিষ্কের কাজ চলে না। নাড়– হাতে হামাগুড়ি দেয়া শিশু, হনুমান, গরু, বৃক্ষ, মায়ের কোলে শিশু, ক্রস, আকাশের তারা, বাঁকানো চাদ, জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেমিক-প্রেমিকা (রাধাকৃষ্ণ), নারীপুরুষের গোপনাঙ্গ (শিবলিঙ্গ) ইত্যাদি কতরকম মূর্তিই না মানুষ কল্পনা করেছে ঈশ্বরের। এমন কোনো ধর্ম নেই যেটিতে কোনো না কোনো ফর্মে মূর্তিপূজা নেই। মূর্তি ছাড়া পূজা বা প্রার্থনা কোনোটাই করা যায় না। মূর্তি দুই রকম হতে পারে: বাস্তব মূর্তি ও ভাবমূর্তি। বাস্তব মূর্তি হিন্দু ধর্মে ‘প্রতিমা’ নামে পরিচিত (এর সাথে সেমিওলজির অধিশব্দ ‘প্রতিমা’-র পার্থক্য আছে)। দেবতার বাস্তব মূর্তি  বা ভাবমূর্তি এই দুটি’র কোনোটিরই নির্দেশিত নেই। বাস্তবে দুর্গা, কালী বা গণেশের অস্তিত্ব আছে এমনটি প্রমাণ করা কঠিন।

বাস্তব মূর্তির সাথে ভাবমূর্তির তফাৎ আছে। ভাবমূর্তির শুধুই দ্যোতিত আছে, কোনো নির্দেশিত নেই। কেউ জানে না, বাংলাদেশের ভাবমূর্তির নির্দেশিতটি দেখতে কেমন। কিন্তু এই ভাবমূর্তি যে আছে তার প্রমাণ এই যে প্রায়ই বাংলাদেশের সরকারী দলের মুখপাত্রদের বক্তব্যে বিরোধীদল কর্তৃক দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অভিযোগ শোনা যায়। মৌলবাদীরা যেমন মাঝে মাঝে হিন্দুমন্দিরে দেবমূর্তি ভাঙে তেমনি দেশের তথাকথিত ‘শত্রুরা’ (প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাবরের shatrus) হরহামেশা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। নষ্ট হওয়ার কথা যখন উঠছে তখন এটা নিশ্চিত, মূর্তিটিও আছে কোথাও না কোথাও। সরকার মাটি পাথরের মূর্তির জন্য ততটা উদ্বিগ্ন হয় না। কিন্তু নিদারুণ বিচলিত হয় ভাবমূর্তির জন্য। ভাবমূর্তি ভাঙছে বলে যাদের সন্দেহ হয় যেমন, মুনতাসীন মামুন, শাহরিয়ার কবির প্রমুখদের অনেক দিন কারাগারে বন্দী করে রাখা হয় দেশের ভাবমূর্তিকে অটুট রাখার জন্য। প্রাচীন গ্রীক জাতি বা বর্তমানের হিন্দু ধর্মালম্বীরা যদি মূর্তির জন্য দরদ দেখায় তবে তার একটা অর্থ হয়। কিন্তু ইসলামে মূর্তিপূজা সর্বতোভাবে নিষিদ্ধ। মুসলিমপ্রধান এই বাংলাদেশে একটা ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য এই অতি ব্যস্ততার কারণ কি? সমাজমনের অবচেতনে বয়ে যাওয়া হিন্দু-বৌদ্ধ অতীতের অনুৎঘাটিত কোনো শেকড় এই মূর্তিরক্ষাজনিত উৎকন্ঠার কারণ কিনা সমাজমনোবিজ্ঞানীরা আশা করি তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন।

এখন ‘অফিসিয়ালি’ একমাত্র হিন্দুরাই মূর্তিপূজা করে। গ্রীক-রোমান আর আরবেরা আগে মূর্তিপূজা করত, এখন ছেড়ে  দিয়েছে। অবশ্য খ্রীষ্টধর্ম আর বৌদ্ধধর্মে এখনও যীশু ও বুদ্ধের একধরনের মূর্তিপূজা চালু আছে। একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোতে যখন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করা হয় তখন মূর্তি ব্যবহার করা না হলেও প্রার্থনাকারীর মস্তিষ্কে কোনো না কোনো ভাবমূর্তি অবশ্যই সৃষ্টি হয়। সেই ভাবমূর্তি মানুষেরই মতো মানুষের প্রার্থনা শুনে  দয়াপরবশ হয়। এই ভাবমূর্তিই সব দেখেন, সব জানেন, সব বোঝেন। ‘জানা’, ‘বোঝা’ বা ‘দেখা’র মতো জৈবিক বা মানবিক গুণগুলো আরোপ করে সেই ভাবমূর্তি গঠিত হয়। ‘ভালবাসা’ বা ‘সৌন্দর্যের মতো বিমূর্ত ধারণার ক্ষেত্রে যেমন হয়, তেমনি এই ভাবমূর্তির অবয়বও জনে জনে আলাদা হতে পারে।

এ রকম ঘটতে বাধ্য, কারণ মানব মস্তিষ্ক একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র। যে কোনো যন্ত্রের ক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া তার নিজস্ব মডিউলগুলোর উপর নির্ভর করে। এছাড়া যে কোনো কম্পিউটার জাতীয় যন্ত্র ডাটা বা প্রদত্ত তথ্য নির্ভর। ইনপুটে যা যা আছে তার উপরই নির্ভর করবে এর আউটপুট। সুতরাং মানবভাষায় যে ঈশ্বরের বর্ণনা দেয়া সম্ভব বা ধর্মগ্রন্থগুলোতে যে ঈশ্বরের বর্ণনা আছে তা একান্তই মানুষের অভিজ্ঞতা ও কল্পনার জোড়াতালি দেয়া একটি চিত্র। এর অন্যথা হওয়া কার্যত অসম্ভব। যতক্ষণ মস্তিষ্ক আছে, ততক্ষণ ঈশ্বরও আছেন। মস্তিষ্ক যে মুহূর্ত থেকে নেই সেই মুহূর্ত থেকে ঈশ্বরও নেই।

আপনারা হয়তো বলবেন, ‘মানলাম’ ঈশ্বর মানুষের মস্তিষ্কের সৃষ্টি, কাল্পনিক একটি মূর্তি বা ছবি। তাতে কি প্রমাণ হলো যে ঈশ্বর নেই? না, তা নয়। আমি শুধু এটুকুই বলতে চাই মানুষের মস্তিষ্ক যে ঈশ্বরকে কল্পনা করে বা করতে পারে সেই ঈশ্বর আছে কি নেই সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলা অসম্ভব। যেমন আমরা বলি, অন্য গ্রহে প্রাণী আছে। কিন্তু আদৌ প্রাণী আছে কিনা, বা সেসব প্রাণীকে আদৌ ‘প্রাণী’ বলা যাবে কিনা − এ ব্যাপারে নিশ্চত করে কিছু বলা মানুষের সাধ্যের বাইরে। সোনা আছে, পাহাড়ও আছে, সোনা আর পাহাড় মিলিয়ে ‘সোনার পাহাড়’ মানুষ কল্পনা করে কিন্তু ‘সোনার পাহাড়’ এখনও পর্যন্ত কোথাও আবিষ্কৃত হয়নি। হাতি-ঘোড়া আছে, মানুষও আছে কিন্তু ‘হাতি-মানুষ’ (গনেশ) বা ‘ঘোড়া-মানুষ’ (গ্রীক পুরাণের সেন্টর) আছে কি নেই তা আমরা জানি না। ‘অকল্পনীয়’, ‘অচিন্তনীয়’ যে ঈশ্বরের কথা আমরা শুনি মানুষের মস্তিষ্ক তাকে ধারণ করতে পারে না। মানুষ যার কথা ভাবতে পর্যন্ত পারে না কিভাবে তাকে বর্ণনা করবে মানুষ? তাঁর কাছে প্রার্থনা করে কি হবে − তিনি কি মানুষ যে প্রার্থনায় তৃপ্ত হবেন? সুতরাং যে ঈশ্বরের কথা আমরা বহু যুগ ধরে শুনে আসছি তিনি থাকলেই বা কি, না থাকলেই বা কি। এ বছর কোন ছবি অস্কার পেল তাতে অন্ধের কি যায় আসে?

ঈশ্বর ও সংখ্যা

ঈশ্বর কি বিমূর্ত ধারণা? বিমূর্ত অবশ্যই তবে বিমূর্ততারও বিভিন্ন রকমফের আছে। ‘ভালোবাসা’ ‘সৌন্দর্য’ বা ‘ঈশ্বর’ এ সবই বিমূর্ত ধারণা কারণ এসব চিহ্নের কোনো রেফারেন্ট বা নির্দেশিত নেই, কিন্তু মস্তিষ্কে দ্যোতকগুলোর দ্যোতিত আছে। মস্তিষ্কের বিশেষ একটি অনুভবের নাম ‘ভালোবাসা’। মস্তিষ্কে অনুভূত বিশেষ একটি ‘গুণ’-এর নাম সৌন্দর্য। কিন্তু এসব অনুভব বা বোধ সর্বত্র বিরাজমান নয়। আপনার চারপাশে ভালোবাসা বা সৌন্দর্য ছড়িয়ে নেই। সেখানে ঘৃণা আছে, বিশ্রীভাব আছে। ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান। ঈশ্বর যদি সর্বত্র বিরাজমান না হন তবে তার পক্ষে অস্তিত্ববান হওয়া অসম্ভব, কারণ সেক্ষেত্রে এমন কিছু স্থান থাকবে যেখানে ঈশ্বর থাকবেন না। যদি ব্রহ্মা-ের কোনো একটি জায়গায়ও ঈশ্বর না থাকেন তবে মস্তিষ্কের অ্যানালজি মডিউল সব জায়গায় তার অনস্তিত্বের দিকে ইঙ্গিত করতে পারে।

ঈশ্বরের সর্বত্র বিরাজিত থাকার ব্যাপারটা মেনে নেওয়া যায় যদি মানুষের বোধের আওতায় ঈশ্বর ছাড়াও অন্তত অন্য একটি ধারণা থাকে যেটি সর্বত্র বিরাজমান। আছে তেমন একটি জিনিষ। জিনিষটি হচ্ছে ‘সংখ্যা’। সৃষ্টির কোথাও আপনি ১, ৩, ৫ সংখ্যাগুলো দেখাতে পারবেন না। অথচ আপনার চারপাশে যে দিকেই তাকান সেদিকেই সংখ্যার ছড়াছড়ি। আপনার বাঁদিকে ৫টি চেয়ার, ডানদিকে ৩টি জলের গ্লাস, সামনে সুন্দর ১টি মেয়ে বা ছেলে আর পেছনে একাধিক শত্রু। যেখানে কিছু নেই সেখানে আছে ০ শূন্য। সংখ্যার এইসব সঙ্কেত আবিষ্কৃত হয়েছিল ভারতে, পরে আরবদের হাত দিয়ে সেগুলো পৌঁছায় ইউরোপে। গ্রীকরা আর রোমানরাও সংখ্যা সঙ্কেত II, V, X, C, L আবিষ্কার করেছিল কিন্তু কোনো কাজের ছিল না সেগুলো। গ্রীক-রোমান দেবদেবীর মতো গ্রীক-রোমান সংখ্যাসঙ্কেতগুলো আজ ইতিহাসের অংশ। ভাষায় রোমান সংখ্যার ব্যবহার আজকের যুগে অনেকাংশে আলঙ্কারিক। সংখ্যার প্রধান ব্যবহার যে গণিত তাতেই রোমান সংখ্যার ব্যবহার নেই। ভারতবর্ষে সংখ্যাসঙ্কেতগুলো (পশ্চিমে যেগুলো ‘আরবীয় সংখ্যা’ নামে পরিচিত) উদ্ভাবিত না হলে আধুনিক গণিতের এত উন্নতি আদৌ হত কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ করা যেতেই পারে।

আপনারা হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, সংখ্যাকে কেন ‘প্রতীক’ না বলে ‘সঙ্কেত’  বলছি। এগুলো প্রতীক নয় কারণ প্রথমত দ্যোতক ১-এর সাথে মানবমস্তিষ্কে সৃষ্টি হওয়া দ্যোতিত ‘এক’-এর যে সম্পর্কটি আছে সেটি একান্তই কাকতালীয় বা আর্বিত্রিক। এই আর্বিত্রিকতা সঙ্কেতের একটি প্রধান লক্ষণ। দ্বিতীয়ত অন্য যে কোনো সঙ্কেতের মতো, সংখ্যার ক্ষেত্রেও সিন্টাক্টিক বা বিন্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১-এর ডান পাশে ০ বসান, ০ এবং ১ উভয়েরই মূল্য বাড়বে। ১-এর বাম দিকে শূন্য বসিয়ে দেখুন, ০ এবং ১ কারও মূল্যই এতটুকু বাড়বে না। পারষ্পরিক অবস্থান যখন এতই গুরুত্বপূর্ণ তখন সংখ্যাগুলো সঙ্কেত না হয়ে যায় না।

সংখ্যার এই বোধ যদি সত্য হয় তবে ঈশ্বরের বোধটিও সত্য হতে বাধা নেই। ‘ঈশ্বর নেই’− এটা প্রমাণ করা যাবে না। এক রকম বাঁচিয়ে দিলাম ‘দাদু’কে (আমার বাপের বাপ ঠাকুরদা’ আর মায়ের বাপ দাদু দু’জনের নামই ছিল ‘ঈশ্বর’)। তার মানে কি তিনি আছেন? ‘আছেন’ বললেই তো ঈশ্বরের নাতিকে আপনারা প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে ব্যতিব্যস্ত করে তুলবেন। ‘ঈশ্বর কি স্বর্গে আদমকে সৃষ্টি করে পৃথিবীতে পাচার করার ক্ষমতা রাখেন?’, ‘ঈশ্বর যদি সর্বশক্তিমান হয়ে থাকেন তবে দড়িতে এমন কোনো গিঁট কি তিনি দিতে পারেন যা তার নিজেরও খোলার ক্ষমতা নেই?’, ‘ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলে কি আমার অমুকের আমেরিকার ভিসা হবে?  ‘ঈশ্বরের কি অতীতকাল পরিবর্তন করার কোনো ক্ষমতা আছে?’ ‘আচ্ছা ঠিক আছে, একটা প্রশ্নের উত্তর দিন শুধু: ঈশ্বর কি সব দেখেন?’

এত সব ভুল প্রশ্নের কি জবাব দিই বলুন। যতই হই না কেন ঈশ্বরের নাতি, আমার ‘নব সংখ্যা দর্শন’ (?)-এর ক্ষমতারওতো একটা সীমা আছে। আপনাদের প্রশ্নগুলোতে মানুষের যাবতীয় গুণ, এই যেমন ধরুন, ‘পাচার করা’, গিঁট খোলা’, ‘সব দেখা’… আপনারা ঈশ্বরের উপর আরোপ করছেন। ঈশ্বর কিছুই দেখেন না, কাউকে কোথাও পাঠান না তিনি। পাঠাতে পারেন কি পারেন না, সব দেখার ক্ষমতা আছে কি নেই − এসব প্রশ্ন অবান্তর। আচ্ছা, আমি যদি বলি, আমাদের ভুলো কুকুরটা ওদের পুসি বিড়ালটাকে ই-মেল করেছে, তবে কি আপনি অবাক হন? নিশ্চয়ই হন, কারণ আপনি ভালো করেই জানেন ভুলো বা পুসির পক্ষে ইলেক্ট্রনিক মেলামেশা সম্ভব নয়। ‘ভুলো’, ‘পুসি’ বা ‘ঈশ্বর’ এরা কেউই মানুষের ক্যাটাগরিতে পড়েন না। সুতরাং মানুষের গুণাবলী এদের কারও মধ্যেই থাকবে না − এটাই স্বাভাবিক। ঈশ্বর সৃষ্টির কর্তা কিনা সে প্রশ্ন অবান্তর। সৃষ্টিশীলতা মানুষের স্বভাবগত একটি গুণ। আমরা বলেছি, মানুষ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণীর এই গুণটি নেই। যখনি মানুষ ঈশ্বরকে ‘সৃষ্টিকর্তা’ বলে তখনি নিজের সৃষ্টিশীলতার গুণটি সে ঈশ্বরের উপর আরোপ করে।

চলবে—

প্রথম পর্বের লিংক: http://www.bdsfbd.com/archives/947

দ্বিতীয় পর্বের লিংক: http://www.bdsfbd.com/archives/950

Related Posts

About The Author

Add Comment