সেমিওলজি ও ঈশ্বর – দ্বিতীয় পর্ব

লেখক, সমালোচক ও ভাষাতাত্ত্বিক শিশির ভট্টাচার্য্যের গুরুত্বপূর্ণ বই ‘ঈশ্বর ধর্ম বিশ্বাস’ এর প্রথম অধ্যায় ‘সেমিওলজি ও ঈশ্বর’ এর  দ্বিতীয় অংশ নিচে দেওয়া হলো:

মানবভাষা সঙ্কেতের সমষ্টি

মানবভাষায় অনেক প্রতীক ব্যবহৃত হয় কিন্তু প্রতীক দিয়ে ভাষা সৃষ্টি হয় না। কেন হয় না? হয় না, কারণ সঙ্কেতের এমন একটি গুণ আছে যা প্রতীকের নেই। সঙ্কেত সাধারণত একা ব্যবহৃত হয় না। আগেই বলা হয়েছে, ভাষা অনেকগুলো সঙ্কেতের সমষ্টি। একটি সঙ্কেত অন্য একটি সঙ্কেতের কোন পাশে বসল এই তথ্যটি ভাষার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ‘খোকা কলা খায়’ বাক্যে তিনটি সঙ্কেতের মধ্যে কোনটি কোন জায়গায় বসবে তা মোটামুটি স্থির হয়ে থাকে ভাষার ব্যাকরণে। সঙ্কেতের এই পারষ্পরিক অবস্থানকে বলা হয় ‘সিন্টাক্টিক’ যাকে আমরা বাংলায় বলব ‘বিন্যাস’। প্রতীকের ক্ষেত্রে এই বিন্যাস ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ‘সিগারেট খাওয়া বারণ’ দ্যোতিত করার জন্য ব্যবহৃত হয় তিনটি দ্যোতক: ১. সিগারেট, ২. গোল বৃত্ত এবং ৩. আড়াআড়ি দাগ বা ক্রস চিহ্ন। সিগারেটের প্রতীকটি বৃত্তের বাইরে, উপরে বা নীচে থাকলে প্রতীকের তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। লোক তখনও বুঝতে পারবে: ‘সিগারেট খাওয়া বারণ’। কিন্তু ‘মানুষ বাঘ মারে’ না বলে যদি কেউ বলে ‘বাঘ মানুষ মারে’ তবে সঠিক ‘সঙ্কেতায়নের’ কাজ থেমে যায় বললেই চলে।

মানব ভাষার অন্যতম উপাদান সঙ্কেত। সঙ্কেত সৃষ্টির জন্য মানুষের দরকার ছিল: ১. দ্যোতক সৃষ্টি করতে পারা এবং ২. দ্যোতিতের সাথে দ্যোতকের সম্পর্ক বা সংযোগ সৃষ্টি হওয়া। ভাষাসৃষ্টির জন্য দ্যোতক আর দ্যোতিতের এই সম্পর্কটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানব-মস্তিষ্ক আর মানবদেহ এ দু’টিই একসঙ্গে প্রতীক সৃষ্টিতে অবদান রেখেছে। বহু লক্ষ বছর ধরে মানুষের শরীরকে এর জন্যে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে। এ কথা বলা যাবে না যে মানবশরীরের উপরোক্ত বিবর্তন মানুষকে কথা বলতে সক্ষম করার জন্যেই হয়েছে। যে কোনো কারণেই হোক, এই বিবর্তনের ফলে মানবশরীর এক বিশেষ অবস্থায় আসার কারণে মানুষের পক্ষে কথা বলা সম্ভব হয়েছে। প্রথমত মুখ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের স্বর ও ব্যঞ্জনধ্বনি সৃষ্টি করার জন্য ১. গলার হলকুম (অর্থাৎ এ্যাডাম্স অ্যাপল বা ল্যারিঙস)-কে নীচে নামতে হয়েছে, ২. দাঁতকে মুখের ভিতরের দিকে ঢুকে বর্তমান অবস্থায় আসতে হয়েছে; ৩. জিহ্বাকে প্রায় সর্বত্রগামী হতে হয়েছে মুখগহ্বরে, এবং একই সাথে ৪. মস্তিষ্ককে যথেষ্ট বিকশিত হতে হয়েছে যাতে দ্যোতক সৃষ্টি ও এর সাথে দ্যোতিতের সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব হয়।

বলাবাহুল্য, মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণীর এই বৈশিষ্ট্যগুলো নেই। শিম্পাঞ্জির এই সব বৈশিষ্ট্য কিছু কিছু আছে বলে শিম্পাঞ্জি কয়েকটি স্বরধ্বনি সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু শিম্পাঞ্জির পক্ষে কথা বলা সম্ভব নয়। রূপকথায় পশুপাখির কথা বলার যে গল্প আমরা শুনি তা একান্তই গালগল্প। পশুদের কোনো ভাষা নেই, অন্তত মানুষের মতো ভাষা নেই কারণ পশুর দেহমনই মানুষের মত বিকশিত নয়। পশুরা যেমন কথা বলতে পারে না তেমনি ছবিও আঁকতে পারে না। সঙ্কেত দূরে থাক, প্রতীক সৃষ্টির ক্ষমতাও যে কোনো পশুর নেই তার প্রমাণ সবচেয়ে বুদ্ধিমান শিম্পাঞ্জিটিও একটি দুই বছরের মানবশিশুর মতো ছবি আঁকতে পারে না।

ছবি আঁকার সাথে কথা বলার সম্পর্ক থাকা অসম্ভব নয়, কারণ ভাষা সঙ্কেতের সমষ্টি এবং যে কোনো সঙ্কেতের দুই দিকে থাকে দুই দুইটি ছবি। ছবি আঁকার ক্ষমতাও মানবমস্তিষ্কে একদিনে তৈরি হয়নি। গুহামানব তার মস্তিষ্ক-বিবর্তনের ঠিক কোন পর্যায়ে ছবি আঁকতে শুরু করেছে বা ভাষা আবিষ্কার করেছে তা আমরা জানি না। মর্গান ও এঙ্গেলসের মতে, আগুন আবিষ্কারেরও আগে বা সমসাময়িক সময়ে মানুষ মানুষে স্পষ্ট উচ্চারণ কথা বলতে শেখে। ছবি আকার ক্ষমতা অর্জন করার পর মানুষ কথা বলার ক্ষমতা অর্জন করেছে  এ রকম ধারণা সম্ভবত অযৌক্তিক নয়।

 

সাদৃশ্যমূল্য ও নির্দেশিত

আমরা উপরে তিন ধরনের চিহ্নের কথা বলেছি: ১. প্রতিমা, ২. প্রতীক ও ৩. সঙ্কেত। প্রতিমার ক্ষেত্রে দ্যোতক ও নির্দেশিতের মধ্যে আকৃতিগত মিল আছে, সঙ্কেতের ক্ষেত্রে এই মিল অপেক্ষাকৃত কম আর সঙ্কেতের ক্ষেত্রে এই মিল একেবারেই নেই। অন্য ভাবে বলা যায়, সঙ্কেতের ক্ষেত্রে দ্যোতিত বা নির্দেশিতের সাথে দ্যোতকের সংযোগ বা সম্পর্ক আর্বিত্রিক কিন্তু প্রতিমার ক্ষেত্রে দ্যোতক ও নির্দেশিতের মধ্যে আকৃতিগত মিলের কারণে এ সম্পর্ক আর্বিত্রিক নয়। আর্বিত্রিক সম্পর্কের ধরনটাই এমন যে সম্পর্ক থাকলে থাকবে, না থাকলে নেই। সম্পর্ক যেখানে আছে সেখানে প্রশ্ন তোলা যাবে না সম্পর্ক থাকার কারণ কী, আর সম্পর্ক যদি না থাকে সেক্ষেত্রেও জিগ্যেস করা যাবে না, সম্পর্ক নেই কেন। কেন ‘কলা’ শব্দ দিয়ে ‘কলা’ ফলটি বোঝানো হচ্ছে তার কোনো সন্তোষজনক উত্তর দেয়া যাবে না। অন্যদিকে কলার মূর্তি, অঙ্কিত চিত্র বা আলোকচিত্র দিয়ে কেন কলা বোঝানো হচ্ছে সে প্রশ্ন কেউই করবে না।

আমরা বলেছি, প্রতিমা, প্রতীক ও সঙ্কেতের পার্থক্যের মূলে আছে নির্দেশিতের সাথে দ্যোতকের সাদৃশ্যের তারতম্য। নির্দেশিতের সাথে দ্যোতকের এই সাদৃশ্যকে বলা যেতে পারে যাকে বাংলায় আমরা বলতে পারি ‘সাদৃশ্যমূল্য’ (Symbolic value )। সব চিহ্নের ক্ষেত্রে দ্যোতক ও নির্দেশিতের সাদৃশ্যমূল্য এক নয়। সাদৃশ্যমূল্যের এই তারতম্যকে একটি স্কেল বা মাপকাঠিতে দেখানো যেতে পারে: প্রতিমা > প্রতীক > সঙ্কেত। নির্দেশিতের সাথে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্য প্রতিমার। সাদৃশ্যের মাপকাঠিতে অতঃপর আসে প্রতীক এবং সবশেষে সঙ্কেত। সিগারেটের আলোকচিত্র হবে সিগারেটের ‘প্রতিমা’। এর সাদৃশ্যমূল্য সবচেয়ে বেশি। সিগারেটের প্রতীকের সাদৃশ্যমূল্য সিগারেটের প্রতিমার তুলনায় কম। প্রতিমা জাতীয় চিহ্নের ক্ষেত্রে নির্দেশিতের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে, কারণ নির্দেশিতের সাথে দ্যোতকের সাদৃশ্যের উপর নির্ভর করে প্রতিমার অস্তিত্ব। কলমের প্রতিমা যদি বাস্তবের কলমের মতো না হয়ে খাতার মতো হয় তবে সেটিকে কলমের প্রতিমা হিসেবে মেনে নেওয়া যাবে না। প্রতিমার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নির্দেশিত থাকতেই হবে এবং এই নির্দেশিতের সাথে দ্যোতকের সাদৃশ্য অপরিহার্য (এমনি অপরিহার্য যে নির্দেশিত না থাকলে প্রতিমাও থাকবে না)।

প্রতীকের ক্ষেত্রে এই বাধ্যবাধকতা অপেক্ষাকৃত কম। কোনো নির্দেশিত নেই এমন প্রতীকও রয়েছে। © প্রতীকটি ‘ভালোবাসা’ দ্যোতিত করে। ভালোবাসা মানব মনের একটি অনুভূতি, এটি বাস্তবের কোনো বস্তু নয়। সুতরাং © প্রতীকটির কোনো নির্দেশিত নেই। কেউ বলতে পারেন, প্রতীকটির সাথে মানুষের হৃদপিণ্ডের আকৃতির মিল আছে। কিন্তু আমরা জানি, ভালোবাসা থেকে শুরু করে যে কোনো অনুভূতি যদি কোথাও থেকে থাকে তবে তা থাকবে মানুষের মস্তিষ্কে, মানুষের হৃদয়ে নয়। সুতরাং হৃদপিণ্ডের সাথে ভালোবাসার যে সম্পর্ক কল্পনা করা হয় তা একান্তই মানুষের সামাজিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ।

লিখিত ও উচ্চারিত উভয় প্রকারে ‘সিগারেট’ একটি সঙ্কেত। লিখিত চারটি অক্ষর: সি-গা-রে-ট বা এসব অক্ষর দ্বারা নির্দেশিত ধ্বনি ‘স-ই-গ-আ-র-এ-ট’-এর সাথে সিগারেটের সাদা কাগজ, বাদামি তামাক বা এর সরু আঙুলের মতো আকৃতি বা পুড়তে থাকা সিগারেটের ধোঁয়ার মধ্যে কোনো প্রকার সাদৃশ্য কল্পনা করা যাবে না। সুতরাং সাদৃশ্যমূল্যের মাপকাঠিতে সঙ্কেতের স্থান সবার নিচে। সঙ্কেত জাতীয় চিহ্নের ক্ষেত্রে নির্দেশিতের ভূমিকা সবচেয়ে কম।

সাদৃশ্যমূল্য যত কমতে থাকে, ততই কমতে থাকে নির্দেশিতের ভূমিকা। প্রতিমার সাদৃশ্যমূল্য সবচেয়ে বেশি, প্রতীকের অপেক্ষাকৃত কম, সঙ্কেতের সাদৃশ্যমূল্য শূন্য। প্রতিমার ক্ষেত্রে দ্যোতক ও নির্দেশিতের সাদৃশ্য যেহেতু সবচেয়ে বেশি, সেহেতু প্রতিমার জন্যে নির্দেশিত থাকা অপরিহার্য। প্রতীকের ক্ষেত্রে সাদৃশ্যমুল্য অপেক্ষাকত কম। স্বাভাবিকভাবেই প্রতীক জাতীয় চিহ্নের ক্ষেত্রে নির্দেশিত থাকার বাধ্যবাধকতা কম এবং সে কারণেই অনেক প্রতীকের নির্দেশিত না থাকলেও চলে। সঙ্কেত জাতীয় চিহ্নে দ্যোতক ও নির্দেশিতের সম্পর্ক আর্বিত্রিক অর্থাৎ সঙ্কেতের সাদৃশ্যমূল্য শূন্য। সাদৃশ্যমূল্য যেহেতু শূন্য সেহেতু নির্দেশিত থাকা বা না থাকায় কিছু আসে যায় না। ভাষিক চিহ্নের জন্য নির্দেশিত গুরুত্বপূর্ণ কোনো উপাদান নয়।

তবে সঙ্কেত-জাতীয় চিহ্নের ক্ষেত্রে নির্দেশিতের প্রত্যক্ষ কোনো ভূমিকা না থাকলেও পরোক্ষ ভূমিকা আছে। ‘কলম’ দ্যোতকটি আপনার পিতামহের মস্তিষ্কে যে দ্যোতিতের সৃষ্টি করত আপনার মস্তিষ্কে তা করে না। আপনার ছোটবেলায় কলমের যে দ্যোতিত ছিল মস্তিষ্কে, আজ আর তা নেই। এর কারণ হচ্ছে ‘কলম’ বস্তু বা নির্দেশিতটির দ্রুত পরিবর্তন হয়েছে। কত রকম কলমই না বের হয়েছে বাজারে গত বিশ বছরে! ‘লেখা’ বলতে আপনার পিতামহ যা বুঝতেন আপনি তা বোঝেন না। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ‘কলম’ শব্দটি বাঙালি-মনে যে চিত্র ফুটিয়ে তুলছে ঊনবিংশ শতাব্দীতে ঠিক সে চিত্র ফুটিয়ে তুলত না। একুশ শতকের শেষে গিয়ে কলমের নির্দেশিত আরও পাল্টে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে পাল্টাবে দ্যোতিতের স্বরূপ, পাল্টে যাবে হয়তো দ্যোতিতটিও। অন্য কোনো দ্যোতক এসে দখল করবে বর্তমান দ্যোতক ‘কলম’-এর স্থান, যেমন আরবি দ্যোতক ‘কলম’ একদিন দখল করেছিল সংস্কৃত দ্যোতক ‘লেখনী’র স্থান। আজকাল অনেকেই কমপিউটারে লেখেন, কলম ব্যবহার করেন শুধু স্বাক্ষর দেবার জন্য। সুতরাং এক শ বছর আগে ‘লেখা’ দ্যোতকটির যে দ্যোতিত ছিল বাংলাভাষীর মনে, আজ আর তা নেই। এভাবে নির্দেশিতের পরিবর্তনের কারণে দ্যোতক ও দ্যোতিত-এই উভয়েরই পরিবর্তন হতে পারে। দেখা যাচ্ছে, ভাষা সৃষ্টি ও এর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বহিঃপ্রকৃতি আর মানব মস্তিষ্কের মিথস্ক্রিয়া (Interaction) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বাঙালি, ফরাসি বা ইংরেজি ভাষামানসের সাথে বহির্জগতের মিথস্ক্রিয়া সম্ভবত এক রকম হয় না। ভাষায় ভাষায় পার্থক্য হওয়ার পেছনে মিথস্ক্রিয়ার এই পার্থক্য সম্ভবত কিছুটা নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

কোনো চিহ্নে সর্বমোট চারটি উপাদান থাকতে পারে: ১. দ্যোতক, ২. দ্যোতিত, ৩. নির্দেশিত এবং ৪. বিন্যাস। প্রতীক ও প্রতিমা জাতীয় চিহ্নের ক্ষেত্রে নির্দেশিতের একটি ভূমিকা আছে, কারণ নির্দেশিতের সঙ্গে দ্যোতকের সাদৃশ্যের উপর নির্ভর করে এই দু’টি চিহ্নের অস্তিত্ব। কলার প্রতিমা যদি একেবারেই বাস্তবের কলার মতো না হয়ে আপেলের মতো হয় তবে সেটিকে কলার প্রতিমা হিসেবে মেনে নেওয়া যাবে না। প্রতিমার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নির্দেশিত থাকে এবং এই নির্দেশিতের সাথে চিহ্নের সাদৃশ্য এমনি অপরিহার্য যে নির্দেশিত না থাকলে প্রতিমাও থাকবে না।

প্রতিটি চিহ্ন এমন এক চতুর্ভুজ যার প্রথম কোণে আছে দ্যোতক, দ্বিতীয় কোণে দ্যোতিত, তৃতীয় কোণে নির্দেশিত আর চতুর্থ কোণে বিন্যাস। সঙ্কেত সম্পূর্ণ বা অসম্পূর্ণ হতে পারে। ‘কলম’ একটি সম্পূর্ণ সঙ্কেত কারণ এর দ্যোতক, দ্যোতিত, নির্দেশিত, বিন্যাস এ চারটি দিকই রয়েছে। যে চিহ্নের দ্যোতক, দ্যোতিত, নির্দেশিত আর বিন্যাস  এ চারটি দিকই রয়েছে সেগুলোকে আমরা সম্পূর্ণ চিহ্ন বলতে পারি। অনেক সঙ্কেতের ক্ষেত্রে দ্যোতক কোণটি ভাঙা থাকতে পারে। ‘ঋক বই পড়ে’ বাক্যের ক্রিয়ারূপটি বর্তমান কাল দ্যোতিত করে কিন্তু বর্তমান কাল দ্যোতক কোনো উপাদান এই ক্রিয়ারূপে নেই (‘পড়ে’ ক্রিয়ারূপের ‘এ’ যে কোনো কালে নামপুরুষ কর্তা দ্যোতিত করে)। অনেক সময় দ্যোতিত কোণটিও ভাঙা থাকতে পারে। ফরাসি ভাষায় নঞর্থক ক্রিয়ারূপে দু’টি উপাদান ব্যবহার করা হয় Il ne lit pas (ইল ন্য লি পা) (আক্ষরিক অনুবাদ: সে না পড়ে না)। প্রথম নঞর্থক উপাদানটির কোনো দ্যোতিত নেই, কারণ কথ্য ফরাসিতে এই উপাদানটি ব্যবহার না করলেও চলে: Il lit pas  (ইল লি পা)। এ ধরনের ক্ষেত্রে অবশ্য ‘এই সঙ্কেতে কোনো দ্যোতক বা দ্যোতিত নেই’- এমনটি বলা যাবে না। বলতে হবে, ‘এই সঙ্কেতের দ্যোতক বা দ্যোতিত স্থানটি শূন্য আছে।’

সঙ্কেত জাতীয় চিহ্নের ক্ষেত্রে বিন্যাস-কোণটি কখনই ভাঙা থাকতে পারবে না।  এ ধরনের চিহ্নের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট বিন্যাস বা সিন্ট্যাক্টিক থাকা বাধ্যতামূলক, অর্থাৎ ‘ক’ ডানদিকে বসবে ‘খ’-এর, নাকি বামদিকে- এ ব্যাপারটা সঙ্কেতের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সব প্রতিবেশেই অন্য সঙ্কেতের ডানে বা বামে যে কোনো দিকে বসতে পারে এমন  ভাষিক সঙ্কেত বিরল। উদাহরণস্বরূপ, ভাষায় কিছু সঙ্কেত শব্দের বামদিকে যুক্ত হয়: প্রতি-কার, উপ-সর্গ। এগুলো ‘উপসর্গ। কিছু সঙ্কেত আবার শব্দের ডানদিকে যুক্ত হয়: কর-আ, ঢাকা-আই। এগুলো ‘প্রত্যয়। উপসর্গ হিসেবেও ব্যবহৃত হয় আবার প্রত্যয় হিসেবেও ব্যবহৃত হয় এমন সঙ্কেত বিরল।

চলবে–

প্রথম পর্বের লিংক: http://www.bdsfbd.com/archives/947

Related Posts

About The Author

Add Comment