সেমিওলজি ও ঈশ্বর – শেষ পর্ব

লেখক, সমালোচক ও ভাষাতাত্ত্বিক শিশির ভট্টাচার্য্যের গুরুত্বপূর্ণ বই ‘ঈশ্বর ধর্ম বিশ্বাস’ এর প্রথম অধ্যায় ‘সেমিওলজি ও ঈশ্বর’ এর  শেষ অংশ নিচে দেওয়া হলো:

দেবতা ও ঈশ্বর: ধ্রুপদ ও খেয়াল

সাম্প্রতিক জিন গবেষণায় আবারও প্রমাণিত হয়েছে যাবতীয় বৈষম্য সত্ত্বেও পৃথিবীর সব মানুষ একই প্রজাতির সদস্য। গবেষণা হয়েছে এমন একটি জাতি নিয়ে যেটি নিজেদের সবচেয়ে অমিশ্রিত বলে মনে করত এতদিন। জাতিটি হচ্ছে জাপানি। জাপানিদের পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে জাপানিদের মধ্যে খাঁটি জাপানি আছে মাত্র ৪% ভাগ। বাকি ৯৬% ভাগ জাপানি নাগরিক চীনা ও কোরীয় বংশোদ্ভূত। পৃথিবীর সব মানুষ যেহেতু এক, সব মানুষের মস্তিষ্কের গঠনও মোটামুটি এক। জন্মের পর পারিপার্শ্বিকতার সাথে মিথষ্ক্রীয়ার কারণে ভাষা ও সংস্কৃতির মতো মানুষের মানসিক কাঠামোও এক এক দেশে এক এক রকম হয়ে যায়। কিন্তু যেহেতু মানুষের মস্তিষ্ক এক, সেহেতু ভাষা-ধর্ম-সংস্কৃতিতে মিলও থাকে অনেকখানি। মিল অবশ্যই আছে। পৃথিবীর ভাষাগুলোর মধ্যে পারষ্পরিক মিল না থাকলে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদ সম্ভব হত না।

মার্কিন ভাষাবিজ্ঞানী নোম চমস্কি বিশ্বব্যাকরণের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন। এই বিশ্বব্যাকরণের দু’টি অংশ: ১. প্রিন্সিপাল যার বাংলা প্রতিশব্দ হতে পারে ‘ধ্রুপদ’, আর ২. প্যারামিটার যার বাংলা প্রতিশব্দ হতে পারে ‘খেয়াল’। চমস্কি মনে করেন, পৃথিবীর সব ভাষার ব্যকরণের ধ্রুপদ অংশটুকু এক। শুধু খেয়াল অংশের পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন ভাষার ব্যাকরণ আলাদা হয়। চমস্কির ধ্রুপদ ও খেয়াল শুধুমাত্র ভাষার দ্যোতক অংশের জন্য প্রযোজ্য। দ্যোতিত অংশে কি ঘটে তা নিয়ে মাথা ঘামাতে তিনি রাজি নন। ভাষার দ্যোতিত অংশেও ধ্রুপদ ও খেয়ালের অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব নয়। আর্থ ধ্রুপদের অস্তিত্বের কারণেই সম্ভবত এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদ সম্ভব হয়। সব ভাষাবিজ্ঞানী অবশ্য এ ধরনের সম্ভাবনার ব্যাপারে নিঃসন্দেহ নন।

চমস্কিকে অনুসরণ করে আমরা বলতে পারি, ঈশ্বর হচ্ছে মানুষের সমাজব্যবস্থায় সৃষ্টি হওয়া একটি ধ্রুপদ। সব সমাজে সব কালে ঈশ্বর ছিল। কিন্তু ভাষার মতোই ঈশ্বরের রূপ আর ধর্মের স্বরূপ এক রকম হতে পারেনি, কারণ সব কালে ও সব দেশে পারিপার্শ্বিকতার সাথে মানব মস্তিষ্কের মিথস্ক্রিয়া সমান হয়নি। সুতরাং ঈশ্বর ধারণার ধ্রুপদ অংশটুকু সব সমাজে কমবেশি এক, কিন্তু এই ধারণার খেয়াল অংশটুকু আলাদা। এ কারণে সব সমাজের সব ধর্মের ঈশ্বরের খেয়ালখুশি বা আচরণও এক রকম নয়। ধ্রুপদ ঈশ্বরকে আমরা বলতে পারি ‘ঈশ্বর’ আর খেয়াল ঈশ্বরকে বলা যেতে পারে ‘দেবতা’। ‘দেবতা’ বা ভাবমূর্তির রূপ আলাদা। ধরা যাক, প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্কে আলাদা আলাদা দেবতার সৃষ্টি হয়।

সুইস ভাষাবিজ্ঞানী ফার্দিন দ্য সস্যুর ভাষাকে দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন। ব্যষ্টিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ভাষা জনে জনে আলাদা। আমরা প্রত্যেকে আলাদা আলাদা বাংলা বলি। প্রত্যেক ব্যক্তির এই যে আলাদা আলাদা ভাষা − সস্যুর ফরাসি ভাষায় এর নাম দিয়েছিলেন ‘পারোল’ যাকে আমরা বাংলায় বলতে পারি ‘বাণী’। আমাদের প্রত্যেকের আলাদা একটি বাংলা ‘বাণী’ রয়েছে। পৃথিবীতে যদি ২০ কোটি বাঙালি থাকে তবে বাংলা ভাষা হবে এই ২০ কোটি বাংলা বাণীর সমষ্টি। একইভাবে বলা যেতে পারে যে পৃথিবীতে যদি ৬০০ কোটি মানুষ থাকে তবে ভাবমূর্তি বা দেবতাও আছে ৬০০ কোটি।

হিন্দু শাস্ত্রকারেরা মাত্র ৩৩ কোটি দেবতার কথা বলতেন এবং তাই শুনে দেবসমাজে পরিবার পরিকল্পনার অভাব নিয়ে রসিকেরা হাসাহাসি করে। হিন্দুধর্মে ঈশ্বর একজন কিন্তু দেবতা ৩৩ কোটি। ব্যাপারটাকে কি এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না পৃথিবীর তখনকার লোকসংখ্যা ৩৩ কোটি বলে ভাবতেন তারা। উপনিষদের ঋষিরা ভাবতেন, বেদের শত শত দেবতা এক ঈশ্বরেরই ভিন্ন ভিন্ন রূপ। সেমিওটিকসের দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা ভাবতে পারি, কোটি কোটি দেবতা বা ভাবমূর্তি মিলিত হয়ে সমাজমানসে সৃষ্টি হয় বিমূর্ত ঈশ্বরের ধারণা। এই ধারণাটিকে ‘দ্যোতিত’ বলা মুষ্কিল কারণ এটি একক কোনো মূর্তি নয়। সুতরাং ঈশ্বরের বহু দ্যোতক আছে বিভিন্ন ভাষায় ‘ঈশ্বর’, আল্লাহ, খোদা, God, Dieu কিন্তু একক কোনো দ্যোতিত সম্ভবত নেই।

একক ব্যক্তির পক্ষে যেমন সম্পুর্ণ বাংলা ভাষা জানা সম্ভব নয় তেমনি একক ব্যক্তির পক্ষে সম্পূর্ণ ঈশ্বরকে কল্পনা করাও সম্ভব নয়। ব্যক্তি মানুষের মনে ঈশ্বরের যে মূর্তিটির সৃষ্টি হয় সেটি একটি দ্যোতিত, কিন্তু এটি ঈশ্বরের একমাত্র দ্যোতিত নয়। উনবিংশ শতকে ফ্রেগো নামে এক জার্মান দার্শনিক লিখেছিলেন, কোনো দু’টি মানুষই এক চাঁদ দেখে না, কারণ কোনো দু’টি মানুষের চোখের রেটিনার আকার এক নয়। চাঁদের সাথে ঈশ্বরের একটি পার্থক্য আছে: চাদের একটি নির্দেশিত আছে: আকাশে ঝুলতে থাকা চাঁদ। প্রত্যেকের মনে সৃষ্টি হওয়া চাঁদের দ্যোতিতকে এর নির্দেশিতের সাথে মিলিয়ে নেয়া যায়। কোনো দু’টি মানুষের মস্তিষ্কই এক নয়। সুতরাং আলাদা আলাদা মানুষের মস্তিষ্কে ঈশ্বরের আলাদা দ্যোতিত সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক।

আসল ঈশ্বর যদি থেকেই থাকেন তবে তিনি হবেন ‘অরূপ রতন’। যতই রূপসাগরে ডুব দিক মানুষ, এই অরূপ রতনের সন্ধান অন্তত মানুষের পাবার কথা নয়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সারাজীবনব্যাপী এই ‘জীবনদেবতা’র সন্ধান করেছেন। এত খুঁজে শেষ পর্যন্ত কি হলো শুনুন, রবীন্দ্রনাথের নিজেরই ভাষায় : ‘দিবসের শেষ সূর্য শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল, পশ্চিম সাগর তীরে নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়: কে তুমি? পেল না উত্তর।’ উত্তর আসার কথা নয়, কারণ ঈশ্বর যেহেতু মানুষ নন, সেহেতু প্রশ্ন বা উত্তর কোনোটারই ধার তিনি ধারেন না। আবার উত্তর পেলেও কোনো লাভ হত না রবীন্দ্রনাথের। রবীন্দ্রনাথ প্রশ্ন করেছিলেন মানুষের ভাষা বাংলায়। কোনো উত্তর যদি এসেও থাকে তবে তা এসেছিল গায়েবী ভাষা বা দৈববাণীতে। এ ভাষা কবি বা নবী দু’জনের এক জনেরও বোধগম্য হওয়ার কথা নয়। যত ক্ষমতাই থাক না কেন এই দুই ব্যক্তির, এরা দু’জনেই মানুষ, এদের মস্তিষ্ক এবং ভাষা দুইই মানুষের।

 

ঈশ্বর: প্রয়োজনীয় একটি চিহ্ন

অনেক হুজুগে নাস্তিক (‘জ্ঞানী নাস্তিক’ যারা অর্থাৎ যারা জেনে শুনে নাস্তিক হয়েছেন তাদের কথা আলাদা) ঈশ্বর ও ধর্ম − এই দু’টি চিহ্নকে সমাজ থেকে চিরতরে বাদ দেওয়ার পক্ষপাতী। তাদের মতে: ঈশ্বর আর ধর্মের কারণে বহু যুদ্ধ, বহু দাঙ্গা, বহু রক্তপাত হয়েছে। এই ‘কুসংস্কার’ দু’টি মানুষে মানুষে বিভেদই সৃষ্টি করে শুধু। কিন্তু রক্তপাত তো বিজ্ঞানের কারণেও কম হয়নি। অ্যাটম বোমা থেকে শুরু করে ল্যান্ড মাইন পর্যন্ত এত বিচিত্র সব মারণাস্ত্র দাড়িওয়ালা মোল্লা বা টিকিধারী ব্রাহ্মণেরা তৈরি করেনি। শুধু ধর্ম নয়, বিজ্ঞানও মানুষের ধ্বংসের কারণ হয়েছে বহুবার। কিন্তু তাই বলে সমাজ ও জীবন থেকে বিজ্ঞানকে বাদ দেবার দাবি কেউ করেন না। বিজ্ঞান যেমন বোমা বানিয়েছে তেমনি কম্পিউটারও বানিয়েছে। ধর্ম বহুবার মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে মানবসভ্যতার গত পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসে, কিন্তু মানুষের বহুবিধ উন্নতিও এই ধর্মের কারণেই হয়েছে। শুধুমাত্র বাইবেলের অনুবাদ করার প্রয়োজনে পৃথিবীর কত ভাষার প্রথম ব্যাকরণ লেখা হয়েছে, রচিত হয়েছে অভিধান। ধর্ম যদি না থাকত তবে মন্দির-মসজিদ-গীর্জা-প্যাগোডার মতো এত সুন্দর সব স্থাপত্য নিদর্শনই আমরা পেতাম কিভাবে? ধর্মের কারণে কত কত দর্শন, কাব্য রচিত হয়েছে। কোরান-বাইবেল-গীতা-ত্রিপিটককে ঈশ্বরের বাণী বলে স্বীকার করুন বা না করুন, এসব রচনার দার্শনিক ও সাহিত্যিক মূল্য অপরিসীম। ধর্মই যুদ্ধের একমাত্র কারণ নয়। বর্তমান শতকে ধর্মের কারণে অনেক দাঙ্গা হয়েছে এটা ঠিক, কিন্তু বড় বড় যুদ্ধগুলো, যেমন দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধের একটিও ধর্মের কারণে হয়নি। সুতরাং মানব সভ্যতার বিকাশের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের মতো ধর্মেরও নেতিবাচক ও ইতিবাচক এই উভয় জাতীয় অবদান রয়েছে।

সমাজমানষের ক্রমবিবর্তনের ফলে ঈশ্বর ধারণাটি তৈরি হয়েছে মানুষেরই একটি বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োজনে। যদি মৃত্যু না থাকত, জীবনে পদে পদে বিপদ না থাকত, তবে ঈশ্বর ধারণার সৃষ্টি হত না মানুষের মনে। উন্নত দেশগুলোতে ঈশ্বরে অবিশ্বাসী লোকের সংখ্যা বেশি, কারণ সেখানে গড়পড়তা মানুষের জীবনে আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা আছে। অনিশ্চিত জীবনে এমন কাউকে মানুষের দরকার যে তাকে নিরাপত্তা দেবে। জীবনের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য সামাজিক শৃঙ্খলা একান্ত জরুরী। আমরা একে অন্যের ক্ষতি করব না। কেন করব না? করব না, কারণ তা পাপ। পাপ করলে অসুবিধা কি? অসুবিধা আছে। পৃথিবীতে শাস্তি পাবে তোমার পাপের জন্যে। জীবৎকালে শাস্তি যদি তুমি নাও পাও, তবে মৃত্যুর পরে পাপী তুমি সোজা যাবে নরকে আর পূণ্যবানেরা তোমাকে বাই বাই জানিয়ে ড্যাং ড্যাং করে রওয়ানা দেবে স্বর্গের পানে। সোজা হিসাব। ঈশ্বর ধারণার এই ফাংশনাল বা কেজো দিকটিকে উপেক্ষা করা চলে না। সমাজ চালাতে গেলে অনেক ফাংশনাল ধারণার প্রয়োজন হয়। ‘সত্য’ আর ‘ন্যায়বিচার’ এ রকম দু’টি ফাংশনাল ধারণা। সত্য বা ন্যায়বিচার বলে হয়তো আসলে কিছু নেই, কিন্তু সত্য বা ন্যায়বিচারকে বাদ দিয়েও সমাজ চালানো সম্ভব নয়।

ঈশ্বর ও ধর্মকে কোনোমতেই সমাজের সব ধরনের বৈষম্যের উৎস বলা যাবে না। ধনী-গরীবের যে বৈষম্য তা ধর্মের সৃষ্টি নয়। কমিউনিষ্ট রাষ্ট্রগুলোতে ধর্মকে নির্বাসন দিয়েও শ্রেণীবৈষম্য বিলুপ্ত করা যায়নি। সমাজে শ্রেণী সৃষ্টি হয়ে চলে, কারণ প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্কের গঠন এক হলেও প্রতিটি মস্তিষ্কের প্রকৃতি আলাদা, পারিপার্শ্বিকতার সাথে তার মিথস্ক্রিয়াও এক নয়। সুতরাং প্রতিটি মানুষ অন্য একটি মানুষের চাইতে কিছুটা হলেও আলাদা। গভীরতর বিশ্লেষণে এই সত্যটিই উজ্জলতর হবে যে ধর্ম না থাকলেও সমাজে বৈষম্য বা বিভেদ সৃষ্টি হতে বাধা নেই। সৃষ্টির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য বৈচিত্র্য। লোকে যেমন বলে: হাতের পাঁচ আঙুল সমান হয় না, তেমনি সমাজ যতদিন আছে ততদিন বৈষম্যও থাকবে। তবে আমাদের চেষ্টা থাকবে, এই বৈষম্য যাতে যথাসম্ভব কমিয়ে আনা যায়।

বিজ্ঞান, ধর্ম, ঈশ্বর… ইত্যাদি ধারণা ইতি-নেতি-নিরপেক্ষ অর্থাৎ এগুলো নেতিবাচকও নয়, ইতিবাচকও নয়। ব্যবহারের কারণেই এসব ধারণা ভালো বা খারাপ বলে মনে হয়। দোষ ঈশ্বরেরও নয়, বিজ্ঞানেরও নয়, দোষ মানবচরিত্রের। অসৎ লোকের হাতে পড়লে বিজ্ঞান ও ধর্ম উভয়েরই অপব্যবহার হয়ে থাকে। ধান্দাবাজ নেতারা ধর্ম আর ঈশ্বর ধারণার অপব্যবহার করে সমাজে অন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করে। কিন্তু সৎ ও চরিত্রবান নেতারা এ দু’টি ধারণার সঠিক ব্যবহার করে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করতে পারেন। বহুজনের হিত ও সুখ ধর্মের লক্ষ্য। প্রায় প্রত্যেক ধর্মই মানুষে মানুষে সমানাধিকারের কথা বলে এবং সাধারণত দরিদ্র্যের পক্ষে থাকে। খ্রিস্টধর্ম এমন কথাও বলা হয়েছে যে ‘সূচের ছিদ্র দিয়ে উট চলে গেলেও যেতে পারে কিন্তু ধনী ব্যক্তি স্বর্গে যেতে পারবে না।’ ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে ‘অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই। এসব কথা মেনে চললে সমাজের ভালো ছাড়া খারাপ হবার কথা নয়। সুতরাং ‘ধর্ম’ ও ‘ঈশ্বর’− এ দু’টি ধারণাকে জোর করে বাদ না দিয়ে সমাজ-অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

বিজ্ঞান, ধর্ম ও ঈশ্বর এক একটি বৃক্ষের মতো। বৃক্ষে কাঁটাও আছে ফলও আছে। কাঁটা বাদ দিয়ে ফল পেড়ে খেতে জানতে হবে। কাঁটার যন্ত্রণার ভয়ে পুরো গাছটিকেই যদি কেটে ফেলা হয় তবে এর ফল থেকেও সমাজ বঞ্চিত হবে। যে কোনো ধর্ম হচ্ছে কাঁঠালের মতো। কাঁঠালের সবটা মানুষ খেতে পারে না।  গরু সবটা খেতে পারে। যারা ধর্মকে অক্ষরে অক্ষরে মানতে চায় তাদের সঙ্গে গরুর মিল আছে। ধর্ম যদি মানব সমাজে কোনো সমস্যার কারণ হয়েই থাকে তবে তা যতটা না ধর্মের দোষে তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের দুর্বুদ্ধির দোষে। কাঁঠালের কোষ না খেয়ে কেউ যদি আঠা খাওয়া শুরু করে তবে তা কাঁঠালের দোষ নয়। কাঁঠাল যেহেতু ‘জাতীয় ফল’ সেহেতু তার মধ্যে রস, আঠা, কাঁটা, বীচি, ভূতি সবই থাকবে, কারণ যে কোনো জাতি হচ্ছে বারো ভূতের আড্ডা এবং সব ভূতের প্রয়োজন সমান নয়। নির্বোধেরা কাঁঠালের আঠা বাঁচিয়ে চলতে পারে না। নির্বোধের যদি রবীন্দ্রনাথের মতো দাড়ি থাকে তবে তার পক্ষে কাঁঠাল খাওয়া আরও কঠিন। ‘তোমভি কাঁঠাল খায়া’ গল্পের কাবুলিওয়ালার মতো নির্বোধদের চুল-দাড়িতে ধর্মের আঠা জড়িয়ে যায়, রস পেটে ঢুকে না।

পৃথিবীর প্রধান ধর্মগুলোর প্রত্যেকটিরই বয়স হয়ে গেছে হাজার বছরের বেশি। হাজার বছর আগের মানুষ আর আজকের মানুষে পার্থক্য অনেক। হাজার বছর আগের সমাজের সাথে আজকের সমাজের মিল সামান্যই। ধর্মের নিয়মগুলো তৈরি হয়েছিল হাজার বছর আগের মানুষ আর সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে। হাজার হাজার বছর পরে এই সব নিয়মের উপযোগিতা সমান না হলেও প্রজন্মক্রমে মানতে মানতে ‘ধর্ম’ ও ‘ঈশ্বর’ ধারণা মানুষের বিশ্বাসের অন্তর্গত উপাদান হয়ে গেছে। এই দু’টি ধারণাকে কিছু লোক অন্তরে লালন করে কিন্তু অনেকেই প্রকাশ্যে জাহির করতে চায়। আপনারা গায়ে দিন বা না দিন, এ ব্যাপারে আমি আমার নিজের ব্যবহার করা একটি ‘ফতুয়া’ আপনাদের দিতে চাই: ‘বিশ্বাস হচ্ছে অর্ন্তবাসের মতো, সবাইকে দেখাতে নেই। যারা মনের বিশ্বাসকে প্রকাশ্যে জাহির করতে চায় তারা সুপারম্যানের মতো প্যান্টের উপর জাঙ্গিয়া পড়ে থাকে।’

হাজার বছরে মানুষ মেধায়-মননে বেড়েছে অনেক, কিন্তু জাঙ্গিয়া সেই একই রয়ে গেছে। কিছু কিছু দুর্বুদ্ধিজীবী ধর্মগ্রন্থের পরিবর্তন চান। পাগলামী! কালিদাসের মেঘদূত কি আবার নতুন করে লেখা যাবে? মেঘদূতে যদি কোনো ভুল থেকেই থাকে তবে সেই ভুলসহই মেঘদূতকে মেনে নিতে হবে। মেনে নেবো, সম্মান করব ধর্মগ্রন্থকে, কিন্তু এর সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও সচেতন থাকবো। সমাজ ও ব্যক্তির প্রয়োজন অনুসারে ধর্মের বহুবিধ ব্যাখ্যা সম্ভব এবং মানুষ তার প্রয়োজনমত তা করেও থাকে। প্রমাণ: হিন্দু শাস্ত্রের টীকা আর ইসলাম ধর্মের তাফসির। বিজ্ঞানের মতোই ধর্ম ও ঈশ্বর ধারণার পরিমিত ব্যবহার বাঞ্ছনীয়।

কেমন হতে পারে সেই পরিমিত ব্যবহার? মনে করুন, আপনার মায়ের পুরোনো কাপড়ের বাক্স খুজে আপনি আপনার ছোটবেলার একটি জামা খুঁজে পেলেন। যে কোনো কারণে বা প্রয়োজনে জামাটি পড়তে গেলে হয় জামাটি ছিঁড়ে যাবে অথবা আপনার শরীর কেটে যাবে। এমতাবস্থায় কি করা যায়? জামাটির তিন ধরনের ব্যবহারের কথা ভাবা যেতে পারে : ১. ড্রয়িংরুমের এক জায়গায় ঝুলিয়ে রাখলেন জামাটিকে (জামাটি আপনার অতীত। আপনার ছেলেমেয়ে-বন্ধুবান্ধবেরা আপনার ছেলেবেলার জামাটি দেখে চমৎকৃত হবে); ২. জামাটির সাথে নতুন কাপড় জোড়া দিয়ে বড়সড় করে নিয়ে জামাটি আবার ব্যবহার করা শুরু করলেন; ৩. নিজেকেই কেটেকুটে জামার মাপে ছোট করে নিলেন। তাতে আপনি নিজে মরলেও জামাটি তো বাঁচল!

পাশ্চাত্যে সুন্দর সুন্দর সব গীর্জা। বছর বছর এগুলো সংস্কার করা হয়। পাশ্চাত্যের মানুষ এসব ধর্মস্থানের ভিতরে খুব একটা ঢুকে না কিন্তু দূর থেকে নিজেদের সুন্দর অতীত দেখে আনন্দ পায়। মৌলবাদীরা হাজার বছর আগের ধর্মকে অক্ষরে অক্ষরে মানতে গিয়ে মানুষকে কেটে ছোট করতে চায়। এতে মানুষ মরে যায়। মানুষ মরে গেলে ধর্মও বাঁচে না। অথবা যা বাঁচে তা ধর্ম নয়, অধর্ম। ধর্মের মূল নিয়মগুলো এতই সার্বজনীন যে এগুলো যে কোনো যুগে যে কোনো মানুষের জীবনের সাথে কমবেশি মিলে যেতে পারে। বুদ্ধিমান মধ্যপন্থীরা ধর্মের কম গুরুত্বপূর্ণ ও যুগ-অনুপযোগী নিয়মগুলোকে সতর্কতার সাথে এড়িয়ে চলতে জানে, অর্থাৎ আঠা বাঁচিয়ে শুধু কাঠালের রসটুকু খেতে জানে তারা। এতে ধর্ম আর মানুষ উভয়েরই মঙ্গল।

ভলতেয়ারকে একবার নাকি জিগ্যেস করা হয়েছিল: মন্ত্র দিয়ে আদৌ ভেড়া মারা যায় কিনা। তিনি জবাব দিয়েছিলেন: ‘অবশ্যই যায় তবে তার আগে একটু সেঁকো বিষ খাইয়ে দিলে ভালো হয়।’ ধর্ম আর ঈশ্বর ছাড়া যে সমাজ চলে না তা নয় তবে এ দু’টি ধারণা থাকলে ভালো হয়। ঈশ্বর ও ধর্মের প্রধান সুবিধা হচ্ছে এই যে মানুষের মনে এই ধারণা দু’টি থাকার ফলে সে কমবেশি পাপ থেকে বিরত হয়। সব সমাজেই কিছু কিছু বকধার্মিক লোক ধর্ম ও ঈশ্বর উভয়কে কলা দেখায় − এটা ঠিক, কিন্তু সমাজের বেশির ভাগ মানুষই হরহামেশা পাপ করেন না, কারণ তাদের মধ্যে পাপ ও পূণ্যের এক ধরনের বোধ কাজ করে। সাধারণ মানুষের মনে এই বোধের উৎস ঈশ্বর ও ধর্ম। পাপের শাস্তি ও পুণ্যের পুরস্কার দেবার জন্য ঈশ্বরজাতীয় কেউ যদি না থাকেন, এবং কোনটা পাপ আর কোনটা পূণ্য তা নির্ধারণ করার জন্য যদি ধর্ম না থাকে তবে আমজনতার মনে পাপ-পূণ্যবোধের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়। কোনো একদিন নতুন কোনো ধারণা দিয়ে ঈশ্বর ও ধর্মকে প্রতিস্থাপিত করা গেলে এ দু’টি ধারণার গুরুত্ব হয়তো নিজে থেকেই কমে যাবে কিন্তু যতদিন তা না করা যাচ্ছে ততদিন এ ধারণা দু’টির নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বজায় রাখাই বাঞ্ছনীয়।

আজকের যুক্তিবাদী চিন্তাধারা সৃষ্টি হয়েছে ইউরোপীয় নবজাগরণের কিছু আগে বা পরে। এর আগে হাজার হাজার বছর ধরে মানুষকে সমাজবদ্ধ করা, মানুষের আদিম মনকে আজকের আধুনিকতার জন্য ধীরে ধীরে তৈরি করার ক্ষেত্রে ধর্ম ও ঈশ্বর প্রধান দু’টি নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। ধর্ম ও ঈশ্বরের ভয়ে এখনও অন্তত কিছু মানুষ সৎ থাকে, সত্যবাদী হয়, পাপ করলে অনুতাপ করে। কিন্তু আগেই বলেছি, সব ভবী ভোলে না। সুতরাং যে কোনো সমাজে অন্যায়-অবিচার থাকে। যাবতীয় অবিচারের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর জন্যে একজন ন্যায়পাল প্রয়োজন। ঈশ্বর সমাজমানসের সেই ন্যায়পাল।

উপরে উল্লেখিত টুকরো টুকরো এই সব ধারণা মিলিয়ে তৈরি হয়েছে মানুষের সমাজদর্শনের পাজল্ বা মোজাইক। রোমান স্থাপত্যে কোনো ইমারতের খিলান আর্চ বা গম্বুজের পুরো কাঠামোটি একটি মাত্র পাথরের অবস্থানের উপর নির্ভর করে। একে বলা হয় ‘কী-স্টোন’ বা ফরাসিতে ‘ক্লে দ্যা ভুউত’। এই পাথরটি খুলে নিলে পুরো খিলান বা গম্বুজটি ভেঙে পড়ে। ঈশ্বর সমাজ-গম্বুজের এই কী-স্টোন। কোনো একক ব্যক্তি ঈশ্বরে বিশ্বাস ছাড়া চলতে পারে। কিন্তু পুরো সমাজের পক্ষে সব সময় তা সম্ভব হয় না। কোনো না কোনো ফর্মে ঈশ্বর বাস করতে থাকেন সমাজ ও ব্যক্তিমানসে। আর ঈশ্বর যদি পুরোপুরি নির্বাসিত না হন তবে কায়ার সঙ্গে ছায়ার মতো, ধর্মও জড়িয়ে থাকে মানুষের মননে, সমাজ ও জীবনে।

নিজের আদলে ঈশ্বরকে কল্পনা করার কাজটি মানুষ প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে করে আসছে, আরও বহুকাল করবে। জানি না, ঈশ্বর ও ধর্মবিহীন সমাজ কোনোদিন গঠন করা সম্ভব হবে কিনা। আমি মনে করি, সম্ভব নয়। কোনো না কোনো ফর্মে এই দু’টি ধারণা ফিরে ফিরে আসবে। এতে আমি ক্ষতির কোনো কারণ দেখি না। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে ঈশ্বর ধারণাকে বাতিল করার চেষ্টা হয়েছিল। সে চেষ্টা সফল হয়নি। সমাজতন্ত্রে অবশ্য এক ধরনের ভ-ামীও ছিল। ঈশ্বরকে নিষিদ্ধ করে সেখানে লেনিনের শবপূজা, মার্ক্স-মাওয়ের মূর্তিপূজা চালু করা হয়েছিল। আমি মনে করি, জোর করে বা আইন জারি করে কোনো ধারণাকে বাতিল করার চেষ্টা না করাই ভালো। সমাজমানসিক গঠনের স্বাভাবিক বিবর্তনের ফলে যদি কোনো ধারণা ধীরে ধীরে নিজে নিজেই অপসৃত হয় তবে সেটাই শ্রেয়তর।

ঈশ্বরকে নিয়ে এত সব কথা বলে ফেলার জন্য আমি ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চাইছি না, কারণ, প্রথমত, আমার এ লেখাটিতে ঈশ্বরকে মানুষের কল্পনার বন্দিদশা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। ‘হিউম্যান’ বা ‘মানুষালী’ গন্ধ থেকে মুক্ত হয়ে ঈশ্বর এখানে আরও বেশি ঐশ্বরিক হয়ে উঠেছেন। দ্বিতীয়ত, ঈশ্বর যদি থেকেই থাকেন তবে তার ইচ্ছা ছাড়া এ লেখাটি আমার পক্ষে সম্ভব হতো না। তৃতীয়ত, ‘ক্ষমা চাওয়া’ একটি মানবিক গুণ। ক্ষমা আমি চাইতেই পারি যেহেতু আমি মানুষ। কিন্তু ঈশ্বরের ক্ষমা করা বা না করার প্রশ্নই ওঠে না কারণ, ঈশ্বর আর যাই হোন, আগেও বলেছি, আবারও বলছি, মানুষ তিনি নন।

 

প্রথম পর্ব: http://www.bdsfbd.com/archives/947

দ্বিতীয় পর্ব:http://www.bdsfbd.com/archives/950

তৃতীয় পর্ব: http://www.bdsfbd.com/archives/957

Related Posts

About The Author

Add Comment