স্ত্রীর জবানিতে স্বামী জীবনানন্দ

“জানি – তবু জানি

নারীর হৃদয় – প্রেম -শিশূ – গৃহ- নয় সবখানি;

অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয় –

আরো এক বিপন্ন বিষ্ময়

আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে

খেলা করে;

আমাদের ক্লান্ত করে;

ক্লান্ত ক্লান্ত করে ;

লাশ কাটা ঘরে

সেই ক্লান্তি নাই,

তাই

লাশকাটা ঘরে

চিৎ হয়ে শূয়ে আছে টেবিলের ‘পরে ।”

(আট বছর আগের একদিন, জীবনানন্দ দাশ)

লাবণ্য দাশবাংলা সাহিত্যের জননন্দিত কবি জীবনানন্দ দাশের আলোচিত, সমালোচিত স্ত্রী লাবণ্য দাশের মুখ থেকে কবির হাড়ির খবর জানার জন্য ‘মানুষ জীবনানন্দ’ বইটি গুরুত্বপূর্ণ। লাবণ্য দাশ এক অসাধারণ কবির সাধারণ স্ত্রী। আর সব চিরায়ত, সংসারী বাঙালী রমণীর মতোই লাবণ্য দাশ। লাবণ্য দাশ তার জীবনের সীমানা নির্ধারণ করেছিলেন চারদেয়ালে ঘেড়া সংসারের চৌহদ্দীতে। কিন্তু তার স্বামী তার কাছেও থেকে যেন অনেক দূরের মানুষ ছিল। কবিতার এন্টেনায় টেনে নামানোর চেষ্টায় ছিলেন কাল-মহাকাল, চাঁদ, সুরুজ, নীহারিকাপুঞ্জ বা শালিক, শঙ্খচিলের ডানার ঝাপটানি, বা যত্নে-অযত্নে ফুটে থাকা বিভিন্ন বৃক্ষ, লতা-পাতা-ফুলের সংবাদ। আর কবিতার আড়শিতে দেখতে চেয়েছিলেন হাজার বছরে মানবজাতির পথচলা।

এজন্য ঘরে এবং মনের অভ্যন্তরে তাদের মধ্যে বিস্তর ফাড়াক ছিল বৈকি। হয়তো জীবনানন্দ বলতে পারতেন না বা লাবণ্য দাশ সেটা বুঝতে পারতো না। তবে সংসারের বিভিন্ন ঘটনাবলীতে প্রত্যেকের রূপ, বৈশিষ্ট্য আত্মগুণে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে।

‘মানুষ জীবনান্দ’ বইটিতে লাবণ্য দাশের আত্ম সমর্থনের আলেখ্যই নজরে পড়বে। এজন্য পাঠককে গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে। কারণ তিনি যা লিখেছেন তার মধ্যে যে কথা বলতে চাননি তা কিন্তু লুকিয়ে আছে। কথাটি সহজে বললে দাড়ায়-লাবণ্য দাশ অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা, সংসারে টানাটানির কথা যতটা নিয়ে আসার কথা ছিল ততটা নিয়ে আসেননি। তিনি অনেকটা আদর্শ সুখী দম্পতির চিত্র এঁকেছেন। কেউ মারা গেলে সাধারণ মানুষদের মধ্যে এই অসাধারণ গুণ রয়েছে তারা তাদের ভুলগুলো নিয়ে, ব্যর্থতা নিয়ে, দুর্বলতাগুলোকে নিয়ে বেশি কথা বলেন না। বরং তার ভালো গুণগুলোতেই আলো দেন বেশি। আর আত্মীয়-স্বজন, আপনজন হলে তো কথাই নেই। শুধু সুন্দর মুহূর্তগুলো, সুকীর্তিগুলোর স্মৃতিচারণ করে শূণ্যতা কাটানোর চেষ্টা করে। স্বামী জীবনান্দ দাশের ট্রাম দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হওয়া এবং এর ফলশ্রুতিতে মৃত্যুবরণ করার ঘটনাটি লাবণ্য দাশের জীবনে অবশ্যই সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা। এরকম শোকাহত স্ত্রীর কাছ থেকে স্বামীর কথা শুনতে চাইলে সুকীর্তি ছাড়া অন্য কিছু চলে আসা অস্বাভাবিক। এজন্য তিনি যা বলেছেন তার পেছনের অর্থের দিকে মনোযোগ দিয়ে পাঠককে পড়তে হবে।

বইয়ের বিভিন্ন জায়গাতে তাদের সংসারের বিভিন্ন হাস্যরসাত্মক গল্প তুলে এনে হয়তো পাঠকের সামনে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন তারা হয়তো আর সব দম্পত্তির মতো সুখী দম্পতিই ছিল। আমার কাছে মনে হয় লাবণ্য দাশ এসব কথা বলার মাধ্যমে কিছু লুকানোর চেষ্টাও করেছেন। সেটা হয়তো খুবই অপ্রীতিকর, লাবণ্য দাশের মুখ দিয়ে বলা সম্ভব ছিলো না। আর সব সাধারণ রমণীর মতো মৃত স্বামীর গুণগান গাওয়াটাকেই দায়িত্ব মনে করেছেন, সমাজের সামনে নিজেদের দাম্পত্যজীবনের মহিমা বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন।

তবে লাবণ্য দাশ ‘মানুষ জীবনান্দ’ বইটিতে জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে যে বিভিন্ন ঘটনা, বিভিন্ন স্মৃতি তুলে ধরেছেন তা জীবনানন্দ ভক্ত, পাঠক গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা দেবে। একজন স্ত্রীর কাছ থেকে ভালো মানুষ, ভালো বাবা, ভালো ছেলে, ভালো ব্যক্তিত্বের সার্টিফিকেট পেলেও ভালো স্বামীর সার্টিফিকেট পেয়েছেন কিনা সেটা পাঠকের গবেষণার বিষয়।

 

বই: মানুষ জীবনানন্দ

লেখক: লাবণ্য দাশ

প্রকাশনা: ভাষাচিত্র

Related Posts

About The Author

Add Comment