হকিংয়ের ‘থিওরি অব এভরিথিং’ এ এক চুমুক

আজ দিন শুরু করেছিলাম স্টিফেন হকিংয়ের ‘থিওরি অব এভরিথিং’ পড়ার মাধ্যমে। সাতটি লেকচারের সমন্বয়ে গঠিত বইটির সর্বশেষ লেকচার আর্টিকেল হচ্ছে ‘থিওরি অব এভরিথিং’। আগের আর্টিকেলগুলো গত বছর পড়া হয়েছে তাই ঘন্টাদুয়েক সময় বরাদ্ধ করলাম প্রধান এই আর্টিকেলটিতে।

স্টিফেন হকিং এর প্রাণবন্ত আলোচনা বেশ উপভোগ্য। আর্টিকেলটি পড়ে অর্ধেক বুঝেছি আর বাকি অর্ধেক পরবর্তীতে বুঝবো বলে আশা রাখছি। এরকম লেখা পড়ার তাত্পর্য হলো এটি আমাদের মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরনকে সচল করে, সারা জীবনের সকল পঠন পাঠনকে পাশে নিয়ে আসে। সকল অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে দেয় সহজ ভাষায় লিখিত জটিল কিছু কথাকে অনুধাবন করার চেষ্টায়।

স্টিফেন হকিংয়ের লেখায় অন্যান্য বিজ্ঞানী ও দার্শনিকের চিন্তার সারবত্তা খুব সুন্দর করে উঠে আসে। নিউটন, আইনস্টাইন থেকে বিশ শতকের শক্তিমান দার্শনিক ভিৎগেনস্টাইনসহ বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী ও দার্শনিকের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন হকিং। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠে তিনি কীভাবে তার পূর্বসুরীদের বেশ ভালোভাবে রপ্ত করেছিলেন।

পৃথিবীর সকল কিছুকে কী একটি থিওরি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়? এ প্রশ্নকে সামনে রেখে হকিং তার আলোচনা আগিয়েছেন। প্রথমদিকেই পূর্বের কোন কোন বিজ্ঞানী এ প্রচেষ্টায় শ্রম দিয়েছেন তাদের কথা বলেছেন, তাদের চেষ্টা, ব্যর্থতা, কাছাকাছি সাফল্যের কথা বলেছেন। আবার সবকিছুকে একই থিওরি দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব কী না সে ব্যাপারেও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

কিছু কথা খুব ভালো লেগেছে, চিন্তার দরজায় ধাক্কা দিয়েছে। আর্টিকেলটির এক পর্যায়ে বলেন নিউটনের সময়কালে কেউ ইচ্ছে করলে পৃথিবীর পুরো জ্ঞানভাণ্ডারের সঙ্গে ভালো পরিচয় নিয়ে আসতে পারতো। রেনেসাঁ যুগে কারো কারো সম্পর্কে এমন কথাও হয় তিনি বা তারা পৃথিবীতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সব বই পড়ে ফেলেছেন। কিন্তু বর্তমানে জ্ঞানের বিভিন্ন ডিসিপ্লিন এত সম্প্রসারিত হয়েছে সবগুলো ডিসিপ্লিন দূরের কথা কোন একটি বিশেষ ডিসিপ্লিনের উপর দখল রাখা খুবই চ্যালেঞ্জিং। কারণ খুব দ্রুত সেখানে পরিবর্তন চলে আসছে। বেশ কয়েকটি ডিসিপ্লিনে খুবই প্রাথমিক ধারণা নিয়ে জ্ঞানের একটি বিশেষ শাখা বা উপশাখা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে স্কলারদের।

পূর্বে অ্যারিস্টটল থেকে শুরু করে ইমানুয়েল কান্টদের মতো রথী মহারথী দার্শনিকরা মনে করতেন জ্ঞানের তাবত্ জগতেই তাদের বিচরণের জায়গা। কিন্তু বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় এত বেশি উন্নতি ঘটেছে এবং এত বেশি শাখা উপশাখা চলে আসছে এখন যুগটাই হয়ে গিয়েছে ‘স্পেশালিস্টদের’ বা বিশেষজ্ঞদের মানে যারা এক বা সীমিত জ্ঞানকাণ্ডে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছেন বা অর্জনের চেষ্টায় রয়েছেন।

এজন্য বিজ্ঞানসহ জ্ঞানকাণ্ডের অনেকগুলো বিষয়ে দখল রাখা দার্শনিকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে জার্মান দার্শনিক লুডভিগ ভিৎগেনস্টাইনের একটি কথা আর্টিকেলটির শেষ দিকে উল্লেখ করেছেন হকিং। সেটি হলো: ‘দর্শনের একমাত্র কাজ হয়ে দাড়িয়েছে ভাষা বিশ্লেষণ।’ (The sole remaining task for philosophy is the analysis of language.)

এ কারণেই আমরা দেখি বিশ শতকে সবচেয়ে প্রভাবশালী ডিসিপ্লিন হিসেবে দাড়িয়েছে ভাষাবিজ্ঞান। এবং বিশ শতকের সব প্রভাবশালী দার্শনিকেরই মূল অবদান ভাষাবিজ্ঞানে। আর্টিকেলটি শেষ হয়েছে এক ফাউস্টিয় উচ্চাকাঙ্খা নিয়ে! ঈশ্বরের পরিকল্পনা জানার দুঃসাহসী সম্ভাবনা নিয়ে! থিওরি অব এভরিথিং এ যদি পৌছা যায় তাহলে যেটি সম্ভব হবে সেদিকে ইশারা দিয়ে হকিং বলেন, ‘If we find the answer to that, it would be the ultimate triumph of human reason. For then we would know the mind of God.’

Related Posts

About The Author

Add Comment