অসাধারণ এক লেকচার, অতঃপর হলের ছাদে স্বপ্নঘুম!

গতকাল অনুষ্ঠিত শিশির ভট্টাচার্য্যের ‘ঈশ্বর ধর্ম বিশ্বাস’ লেকচারটি একটি অসাধারণ লেকচার ছিল। শিশির ভট্টাচার্য্য বাংলাদেশের অল্প কয়েকজন পণ্ডিতদের একজন যার লেখা এবং বলা দুটোই অসাধারণ। তার গদ্যে যেমন রয়েছে রসের মাধুর্য্য কথাও রয়েছে সৌন্দর্য্যের বাহার। এজন্য পণ্ডিত থেকে ছাত্র, নবীন থেকে প্রবীণ সবার কাছেই তার আলোচনা অতি মনোহর। আর জ্ঞানপিপাসুদের জন্য শিশির ভট্টাচার্য্য জ্ঞানের এক ফল্গুধারা! আমরা এই নিত্য প্রবাহমান, নিত্য বিকাশমান জ্ঞানের ফল্গুধারায় স্নান করে নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করেছি। শিশির ভট্টাচার্য্যকে অনেক ধন্যবাদ ও অশেষ কৃতজ্ঞতা! চীনা ভাষা বিভাগের ৩০১ নম্বর ক্লাসরুম ভরে গিয়ে পাশের রুমটিও পূর্ণ হয়ে প্রমাণিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো পুরো অন্ধকার নেমে আসেনি। এখনো এমন প্রফেসর আছেন যাদের বক্তৃতা শুনার জন্য বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা চলে আসে, রুম ভরপুর হয়ে যায় এবং পিনপতন নিরবতায় শেষ পর্যন্ত বসে থাকে। মাত্র ৬০-৭০ জনের সংকুলান করা ৩০১ নম্বর রুমটিতে ১২০-৩০ জনকে জায়গা দেওয়া অসম্ভবই ছিল। তাই মাঝের পার্টিশন তুলে দিয়ে দুই রুমকে আমাদের লেকচার রুম বানিয়ে ফেলতে হলো। যদিও আমাদের আগে থেকেই প্রস্তুতি ছিল এবং আমরা এমনটাই আশা করেছিলাম। শিশির ভট্টাচার্য্যের লেকচারে স্বপ্ন ও বাস্তবতার এত সুন্দর মিল আমাদেরকে আশাবাদী, স্বপ্নবিলাসী হতে আরও উসকে দিল!

লেকচার শেষে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের সদ্য চালু হওয়া ‘ভাষা ক্যাফে’তে পাকুরা সহযোগে চা পানের আগ পর্যন্ত আরও ত্রিশ-চল্লিশ মিনিট জম্পেশ আড্ডা হয়। স্টাডি ফোরামের বন্ধুরা এই অন্তরঙ্গ আলাপে নিজেদেরকে সমৃদ্ধ মনে করে। এজন্য চা শেষে হাকিম চত্ত্বরে এসেও চলে আরও ঘন্টাখানেক আড্ডা। সব পাখি ঘরে ফিরলেও আমরা কতক রয়ে যাই আড্ডায়। হাকিম থেকে আড্ডা চলে আসে শাহবাগে। বাংলার শিক্ষক আলাউদ্দিন ভাই সেই উত্তরা যাবেন। রাত তখন সাড়ে এগারোটা। আমাদের কষ্ট লাগছিলো বিদায় জানাতে। উনারও যেতে কষ্ট হচ্ছিল। শাহবাগ থেকে উত্তরা যাওয়া করাচি থেকে ওয়াশিংটন যাওয়ার মতোই ব্যাপার। আমাদের বক্তাদেরকে যদি আকাশপথে নিয়ে আসতে পারতাম, বিদায় জানাতে পারতাম! তাদের জন্য মোটামুটি আরামে রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা করতে পারতাম! স্বপ্ন দেখি স্টাডি ফোরামের কোন কোন বক্তা আগামী এক-দুই বছরের মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমনকি বিদেশেও লেকচার দিয়ে আসবে। আর স্টাডি ফোরাম তাদের বিমান টিকেটটি সরবরাহ করে তাদের পথের কষ্ট একটু হলেও কমাবে!

এরকম বিভিন্ন স্বপ্ন দেখাদেখি করতে করতে রাত সাড়ে এগারোটায় পৌছলাম! আলাউদ্দিন ভাই উত্তরার পথে রওয়ানা হলেন, ফেরদৌসি আপা এলিফ্যান্ট রোডে, ঈপ্সিতা পুরান ঢাকায়। আমি আর সাগর বড়ুয়া তখনও আড্ডার নতুন রসদ খুঁজছি চালিয়ে যাওয়ার জন্য যেন পাড় মাতাল আরও এক পেক খেয়ে নেশার ঘোরে মশগুল থাকার চেষ্টা করছে! মাতালদের সময় জ্ঞান নেই! যখন জ্ঞান হয় তখন দেখি বারটা ছুঁইছুঁই! বাসায় ফেরার আল্টিমেটাম সাধারণত এগারোটা, সর্বোচ্চ বারটা! তা নাহলে গেট বন্ধ। তখন জোর করেই সাগরকে বলে বসলাম তার হলে আড্ডা মেরে রাত কাটিয়ে দেওয়ার কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট রাজি হয়ে যাওয়াতে আর যাই কই!

মধ্যরাতে নৈশভোজ শেষে জগন্নাথ হলের নতুন ভবনের ছাদে চলতে থাকে আড্ডা আর স্বপ্নের মহড়া। নয়তলার ছাদে অসাধারণ বাতাস আর দীর্ঘদিন পর স্পষ্ট আকাশে পূর্ণ চাঁদ দেখার সুযোগ হলের রুমগুলোর বদ্ধ জেলখানায় যেতে সায় দিচ্ছিল না। আমার হোস্ট সাগর বড়ুয়াকে বললাম কোন চাটাই বা মাদুর আছে কি না! ছাদে ঘুমানোটাই বেশ হয়। প্রথমে রাজি না হলেও শেষে দেখা গেলো তোষকপাতি নিয়ে প্রস্তুত! টি-শার্ট পড়ে শোয়ার কয়েকমিনিটের মাথাতেই দেখা গেলো শীত লাগা শুরু করেছে। অবশেষে ফুলহাতা শার্ট আবার পড়ে ঘুমিয়ে পড়লাম! মুক্ত আকাশে, মুক্ত বাতাসে বেশ ঘুম হয়েছে। পাখির ডাকে, সূর্যের ষড়যন্ত্রে আটটার দিকে উঠে পড়লাম। দেখি সাগর বড়ুয়া তখনো ঘুমাচ্ছেন। আমি টপ করে আমার আবাসস্থলের দিকে রওয়ানা দিলাম!

 

ক্যাম্পাস ডায়রী

২৩-২৪ এপ্রিল, ২০১৬

Related Posts

About The Author

Add Comment