হানা আরেন্টের অন ভায়োলেন্স অবলম্বনে সহিংসতা ও রাজনীতি

রাজনীতি মাত্রই ক্ষমতার সংগ্রাম। ক্ষমতা হল বলপ্রয়োগ। এ সংগ্রামের চূড়ান্ত রূপ সহিংসতা। রাজনীতি মাত্রই তার নিজেকে বৈধতা দানের সংগ্রাম করে। এ সংগ্রাম হল এমন এক সংগ্রাম, যেখানে শাসক মনে করে, আমি যা পছন্দ করি সকলে সেটা পছন্দ করতেই বাধ্য। আর এই কাজের বৈধতা হিসেবেই আইন তৈরি হয়। যেমন- সকলের পরামর্শ ছাড়াই যেন আইন তৈরি করা যায়, এজন্যে হিটলার ১৯৩৫ সালে পাশ করেছিলেন অ্যানেব্লিং অ্যাক্ট। ডিক্টেটোরিয়াল রেজিমের এটা একটা দৃষ্টান্ত।

hannah2

একটি দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম হওয়ার পর সেখানকার শাসক নিজের কাজ ও পছন্দ অনুসারে অপরকে বা জনসাধারণকে বাধ্য করলে, সেখানে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতার চূড়ান্ত রূপ, সহিংসতা উদ্ভূত হয়। এক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি রাজনীতিতে ক্ষমতা চর্চার ভূমিকায় শাসকে পরিণত হলে, তখন তার যতটা না ক্ষমতা থাকে, তার চেয়ে অধিক থাকে ক্ষমতার অপরিমিত ব্যবহার। আর এটাই অনৈতিকভাবে বলপ্রয়োগ, যা হল সহিংসতা। একমাত্র আলেকজন্দে পাসেখা দনখেজে (Alexander Passerin d’entreve) ক্ষমতা ও সহিংসতার মধ্যে পার্থক্যরেখা নিরূপণ করেছেন। তাঁর মতে ক্ষমতা হল বৈধভাবে বলপ্রয়োগের প্রতিষ্ঠিত উপায়। সহিংসতা হল অনৈতিকভাবে বলপ্রয়োগ করে ক্ষমতা দেখানো। অনেক ক্ষেত্রে যুদ্ধ হল এর অন্তিম বিপজ্জনক বহিঃপ্রকাশ।

এক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক শাসন কাঠামোর দুইটি সীমাবদ্ধতা হল, গণতন্ত্র অধিকাংশের অধিকার রক্ষা করে। তাই এর মাধ্যমে অন্যদিকে সংখ্যালঘুর অধিকার খর্ব হয়। এ ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্ষমতাসীন দল জনসাধারণের অধিকার রক্ষা ও সেই সাথে অপরাপর দলীয় আদর্শধারী রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকার রক্ষার প্রতি রক্ষণশীল ও যত্নবান না হলে, আদর্শগত ভিন্নতার কারণে অন্যান্য দল কিংবা জনসাধারণের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয় ও সেই দেশের জনসাধারণ রাষ্ট্রের সহিংস আচরণের শিকার হয়। দ্বিতীয়ত ও প্রধানত, রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা গণতন্ত্র চর্চার সাথে স্ববিরোধী। বিশেষ করে আধুনিক রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সাথে যে উপায়ে চুক্তির মাধ্যমে সম্পর্কিত হয়। এ সম্পর্ক বলে সংখ্যাধিক্যের ক্ষমতা ও গণতন্ত্র চর্চা জারি রাখা ও একই সাথে সেই চুক্তির অধীনে সকলের অধিকার রক্ষা করা কেবল মুশকিল নয়, তা পরস্পর বিরোধীও বটে।

এক্ষেত্রে রাষ্ট্র সকল নাগরিকের জান, মাল আর নিরাপত্তার দায় নিয়ে ও সংখ্যাধিক্যের রাজনৈতিক দর্শন জারি রেখে গণতন্ত্র চর্চার কথা বললেও, তখন ক্ষমতাসীন দলের কাজের বৈধতা অপরাপর দল ও জনসাধারণের কাছে তৈরি না হলে, তা হয়ে ওঠে সাংঘর্ষিক। তখন রাষ্ট্র নিজেই সহিংস হয়ে নাগরিকদের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, জান, মালের নিরাপত্তার স্বাধীনতা হরণ করে। আর রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতা চর্চার দ্বারা অন্যান্য দলীয় আদর্শধারীদের মূলোৎপাটন ঘটে।

কে. এন, ঈপ্সিতা

ঈপ্সিতা

Related Posts

About The Author

Add Comment