হারুকি মুরাকামির সাক্ষাতকার

অনুবাদ: মোজাফ্ফর হোসেন

ভূমিকা: জাপানি কথাসাহিত্যিক হারুকি মুরাকামি বর্তমান সময়ের শুধুমাত্র নিরীক্ষাধর্র্মী উপন্যাসিকই নন, সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাসিকদেরও একজন। বিশ্বব্যাপী তাঁর বই এখন লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রি হচ্ছে। অনুদিত হচ্ছে পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য সব ভাষাতেই। মুরাকামির উপন্যাস বাস্তব এবং কল্পনা জগতের সন্ধিক্ষণে আবাস গাড়ে। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ও অপরাধ জগত দাঁড়িয়ে থাকে এক সরলরেখায়। মুরাকামির জগতটা হল রূপকাশ্রিত বা এলিগরিক্যাল। প্রতীক ও চিত্রকল্প অতি পরিচিত কিন্তু তার অর্থের মুখটা শেষঅবধি আটকানো থাকে।

মুরাকামির জন্ম জাপানের কিয়োটো শহরে। বাবা জাপানি সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন। দাদা ছিলেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। মুরাকামির বয়স যখন দুই তখন তাঁর পরিবার বন্দর শহর কবেতে চলে আসেন। এখানে মুরাকামির সাথে আমেরিকান নাবিকদের সাক্ষাৎ ঘটে। জাপানি সঙ্গীত, শিল্প ও সাহিত্য ছেড়ে মুরাকামি বিশ্বের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

বর্তমানে মুরাকামি জাপানের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। তবে অন্তর্মুখী মুরাকামি নিজেকে লুকাতে বেশ কিছুদিন থেকে দেশের বাইরে বাস করছেন। তিনি ইউরোপ ও আমেরিকায় বসবাস করে আসছেন।

জাপান সাহিত্যে যত পুরস্কার আছে তার প্রায় সবগুলোয় বগলদাবা করেছেন মুরাকামি। জাপান থেকে নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের মনোনয়ন তালিকাতেও উঠে এসেছে তাঁর নাম। তিনি একজন পরিশ্রমী অনুবাদকও বটে। তাঁর বদৌলতে জাপানী পাঠকরা বেশ কিছু উচ্চমার্গীয় সাহিত্যকে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন।

মুরাকামির বর্তমান সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জন রে। প্রকাশিত হয় প্যারিস রিভিউতে। বাংলায় অনুবাদ করেছেন মোজাফ্ফর হোসেন।

জন: আমি কয়দিন আগে শেষ করলাম ‘আফটার দ্য কুয়াক’, আপনার শেষ গল্পের বইটি। আমি খুব মুগ্ধতার সাথে লক্ষ করেছি, আপনি অদ্ভুতভাবে বাস্তব এবং পরাবাস্তবের সম্মিলন ঘটান আপনার গল্পে। একদিকে ‘নরওয়েজিয়ান উড’ অন্যদিকে ‘দ্য ইন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড’–এই দুই ধারার উপন্যাসের কাঠামোর ভেতর মৌলিক কোনো পার্থক্য খুঁজে পান কিনা জানতে চাচ্ছিলাম?

মুরাকামি: আমার ধরন ধরে যদি কথা বলি, তাহলে বলতে হয়Ñ আমার লেখার স্টাইলটা ‘হার্ড বয়েল্ড ওয়ান্ডারল্যান্ড’-এর সাথে খুব মেলে। আমি নিজে লেখার সময় বাস্তববাদী ধরনটা পছন্দ করি না। আমি লিখতে পছন্দ করি পরাবাস্তবতা বা অতিবাস্তবতার কলা অনুসরণ করে। তবে ‘নরওয়েজিয়ান উড’-এর ক্ষেত্রে আমি মনস্থির করেছিলাম শতভাগ বাস্তববাদী একটা উপন্যাস লিখবো বলে। আমার ঐ অভিজ্ঞতার দরকার ছিল।

জন: আপনি কি মনে করেন, ঐ বইটা আপনার জন্যে পরীক্ষামূলক ছিল, নাকি গল্পের প্রয়োজনেই আপনাকে ওটা করতে হয়েছে?

মুরাকামি: আমি যদি অতিবাস্তবতাভিত্তিক উপন্যাসই লিখে যেতাম তাহলে আমাকে কাল্ট লেখক হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু আমি চাচ্ছিলাম মূল ধারায় ঢুকতে, দেখাতে যে আমিও বাস্তববাদী উপন্যাস লিখতে পারি। সে কারণেই মূলত ওটা লেখা। এটা জাপানে ‘বেস্ট সেলার’ বইয়ের খেতাব পায়; এবং আমি জানতাম এমনটি ঘটবে।

জন: তাহলে এটা ছিল একটা নির্দিষ্ট পরিকল্পনার ফসল?

মুরাকামি: তা বলতে পারেন। ‘নরওয়েজিয়ান উড’ খুব সহজে পড়া এবং বোঝা যায়। অনেকেই এটা পছন্দ করেন। তারা এখন আমার অন্য কাজের প্রতিও আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কাজেই এটা কাজে লেগেছে সেটা বলা যায়।

জন: তাহলে কি বলবো, জাপানি পাঠকরা আমেরিকানদের মতো সোজা গল্প পড়তে পছন্দ করে?

মুরাকামি: আমার নতুন বই ‘কাফকা অন দ্য সোর’ বিক্রি হয়েছে ৩ লক্ষ সেট; এটা এখানে দুই খ-ে প্রকাশিত। এই বইটার এখানে এত বিক্রি দেখে আমি আশ্চর্যই হয়েছিলাম। এটা একেবারে যেনতেন বিষয় না। গল্পটা খুব জটিল, সোজা লাইন ধরে এগুনো মুশকিল। তবে আমার গদ্য পড়া বেশ সহজ। গদ্যের ভেতর সেন্স অব হিউমার থাকে, অতি নাটকীয়তাও থাকে কোথাও কোথাও। এ-দুটোর মাঝে একটা চমৎকার বোঝাপড়া থাকে, সেটা একটা কারণ হতে পারে। যে কারণই দশাই না কেন, এটা অবিশ্বাস্য! আমি এখন চারপাঁচ বছর ধরে একটি করে উপন্যাস লিখছি, সেটার জন্যে লোকজন অপেক্ষা করছে। আমি একবার জন আর্ভিং-এর একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, ভাল বই পড়া নেশার মতোন, যদি কেউ এতে নেশা পায়, অপেক্ষা করবেই।

জন: তাহলে কি আপনার পাঠকদের আপনার প্রতি আসক্ত করে রাখতে চান?

মুরাকামি: জন আর্ভিং সেটাই বলেছিলেন।

জন: ঐ দুইটা বিষয়–এক হলো সাবলীল বর্ণনা অন্যটি আশ্চর্য করার মতো ঘটনা–এটা কি সচেতনভাবে আসা সম্ভব?

মুরাকামি: না, সেটা সম্ভব না। আমি যখন লিখি তখন আলাদা করে কোনো পরিকল্পনা থাকে না। আমি গল্পটির জন্যে অপেক্ষা করি। গল্পটা কেমন হবে সেটা আমি নির্বাচন করি না। আমি শুধু অপেক্ষা করি। ‘নরওয়েজিয়ান উড’-এর কথা ভিন্ন। কারণ ওটা আমি ঐভাবেই করতে চেয়েছিলাম। তবে সাধারণ অর্থে সেটা আমি কখনই করি না।

জন: আপনি কি ঐ স্বরটা নির্বাচন করেন, খুব মজা করে গল্প বলার ভঙ্গিটা?

মুরাকামি: আমি কিছু চিত্রকল্প দাড় করাই এবং সেগুলোর মাঝে সম্পর্ক স্থাপন করি। সেই ভাবেই গল্পটা দাড় করাই। তারপর গল্পটা পাঠকদের কাছে বুঝিয়ে বলি। আপনি যখন কাউকে কিছু বোঝাবেন তখন আপনাকে সরল হতেই হবে। আপনি হয়ত এখানে একমত নাও হতে পারেন। সহজ শব্দ এবং যুতসই মেটাফর; কার্যকরী রূপক। সেটাই আমি করি। খুব সহজভাবে সতর্কতার সাথে সব ব্যাখ্যা করি।

জন: সেটা কি আপনার ভেতর থেকে আপনা আপনি চলে আসে?

মুরাকামি: আমি অতি বুদ্ধিমান নয়, একেবারে একগুঁয়েও নয়। আমার বই যারা পড়ে আমি তাদেরই মতো। আমি জ্যাজ ক্লাবে যেতাম, রান্না করতাম। আমি কখনো লেখক হতে চাইনিÑ কেমন করে জানি হয়ে গেলাম! এটা অনেকটা স্বর্গীয় ব্যাপার। তাই আমি মনে করি, আমার যথাসম্ভব বিনীত থাকা উচিৎ।

জন: কত বছর বয়সে আপনি লেখক হলেন? এটা কি শুরুতে আপনাকে বিস্মিত করেছিল?

মুরাকামি: তখন ছিল ২৯ বছর বয়স। হ্যাঁ, অবশ্যই আমি বিস্মিত হয়েছিলাম, তারপর দ্রুতই বুঝে গেছি বিষয়টা।

জন: সঙ্গে সঙ্গে? যেদিন আপনি লিখলেন সেদিনই আপনি স্বস্তি অনুভব করলেন?

মুরাকামি: রান্নাঘরের টেবিলে মধ্য রাত্রিতে লেখা শুরু করি। প্রথম বইটা শেষ করতে আমার দশ মাস লেগেছিল। আমি এটা একটা প্রকাশকের কাছে পাঠিয়েছিলাম তারপর একধরনের পুরস্কার পেলাম। কাজেই ব্যাপারটা ছিল স্বপ্ন পূরণের মতোই। শুরুতে বিস্মিত হলাম পরে ভেবে দেখলাম, হ্যাঁ এটা ঘটে গেছে এবং আজ থেকে আমি লেখক।

জন: আপনার স্ত্রী আপনার লেখালেখি করার সিদ্ধান্তটা কিভাবে নিলেন?

মুরাকামি: সে কিছুই বলেনি। যখন আমি বললাম যে আমি লেখক সে একটু বিস্মিত হলো এবং খানিকটা লজ্জিতও।

জন: লজ্জা পেলেন কেন? তাঁর কি মনে হয়েছিল যে আপনি সফল হতে পারবেন না?

মুরাকামি: লেখক হওয়াটা এখানে খানিকটা লোক দেখানো টাইপের। এজন্যে বোধহয়।

জন: আপনার আদর্শ কারা ছিলেন? কোন কোন জাপানি লেখক আপনার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে?

মুরাকামি: আমি তখন পর্যন্ত খুব বেশি জাপানি বই পড়িনি। আমি এই সংস্কৃতি থেকে পালাতে চেয়েছিলাম। আমার কাছে এটা খুব বিরক্তিকর মনে হতো।

জন: আপনার বাবা তো জাপানি সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন?

মুরাকামি: হুম। বাপ-ছেলের সম্পর্কটাও তেমন ছিল। আমি পশ্চিমা সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়লামÑ জ্যাজ মিউজিক, কাফকা, দস্তয়ভস্কি এবং রেমন্ড চ্যান্ডলার। ওটা ছিল আমার নিজস্ব জগৎ, আমার কল্পলোক। চাইলেই পিটার্সবার্গে কিংবা হলিউডে চলে যেতে পারতামÑ সেটাই ছিল আমার উপন্যাসের শক্তি, আপনি যেখানে খুশি সেখানে চলে যেতে পারেন। এখন তো এক দেশ থেকে আরেক দেশ যাওয়াটা খুব সহজ। যে কেউ পৃথিবীর যে কোনোখানে যেতে পারে। কিন্তু ৬০-এর দশকে অবস্থা এমন ছিল না। তাই আমি পড়তাম এবং সঙ্গীত শুনতাম আর চলে যেতাম সেখানে। এটা ছিল মনের একেক সময়ে একেক ধরনের অবস্থান, অনেকটা স্বপ্নের মতো।

জন: এবং সেটাই আপনাকে লেখার দিকে এগিয়ে দিলো?

মুরাকামি: বটেই। আমার বয়স যখন ২৯, আমি একবারে শূন্য থেকে একটি উপন্যাস লেখা শুরু করলাম। আমি কিছু একটা লিখতে চেয়েছি কিন্তু কিভাবে জানতাম না। জাপানি ভাষায় কিভাবে লিখবো কিছুই জানতাম না, কারণ জাপানি লেখকদের তখনো সেইভাবে পড়িনি। কাজেই আমেরিকা কিংবা পশ্চিমার যে সকল বই পড়েছি সেগুলো থেকে আমি লেখার গঠন, কলাকৌশল সব রপ্ত করেছি। ফলে আমি জাপানে গল্প বলার নিজস্ব একটা তরিকা তৈরি করেছি। শুরুটা এ-ভাবেই।

জন: পরে কি আপনার অন্যান্য লেখকদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হয়েছিল?

মুরাকামি: না, হয়নি।

জন: ঐসময় আপনার কোনো লেখক বন্ধু ছিল না?

মুরাকামি: একদম না।

জন: পরে কি কেউ হয়েছিল?

মুরাকামি: না, হয়নি।

জন: আজ পর্যন্ত কি আপনার কোনো লেখক বন্ধু নেই?

মুরাকামি: আমার তো মনে হয় না।

জন: লিখতে লিখতে আপনি তাহলে কাউকে আপনার পা-ুলিপি দেখাননি?

মুরাকামি: কখনই না।

জন: আপনার স্ত্রীকেও না?

মুরাকামি: আমি আমার প্রথম বইয়ের পা-ুলিপি ওকে দেখিয়েছিলাম। সে বলে যে সে কখনই সেটা পড়েনি। আমার ধারণা তার ভেতর এটা নিয়ে কোনো অনুভূতি হয়নি।

জন: তিনি মুগ্ধ হননি?

মুরাকামি: না। তবে সেটা ছিল প্রথম খসড়া এবং খুব যা-তা! পরে বারবার পুনলেখন করেছি।

জন: এখন যখন আপনি বই লেখেন, তিনি কি কোনো আগ্রহ প্রকাশ করেন?

মুরাকামি: সে আমার প্রতিটা বইয়ের প্রথম পাঠক। যখনই আমি লিখি তার পাঠের ওপর নির্ভর করি। সে আমার সহযোগী হিসেবে কাজ করে। স্কট ফিটজেরাল্ড-এর মতো: তাঁর বউ জেলডা ছিল তাঁর প্রথম পাঠক।

জন: তাহলে আপনি আপনার লেখক-জীবনে কখনো কোনো সম্প্রদায়ের লেখক হিসেবে নিজেকে ভাবতে পারেননি?

মুরাকামি: আমি একা থাকতে পছন্দ করি। প্রিন্সটনে একটা হোটেল ছিল, আমাকে সেখানে দাওয়াত করা হল। জয়েস কারল এবং টনি মরিসন সেখানে ছিলেন, এবং আমি এতটাই ঘাবড়ে গেলাম যে কিছুই মুখে দিতে পারলাম না। ম্যারি মরিসও ছিলেন, তিনি বেশ চমৎকার মানুষ, আমার বয়সীই হবেন, এবং আমাদের ভেতর একধরনের বন্ধুত্বই গড়ে উঠলো। কিন্তু জাপানে তেমনটি ঘটেনি। এখানে আমার কোনো বন্ধু নেই কারণ আমি দূরেই থাকতে পছন্দ করি।

জন: আপনি ‘দ্য উইন্ড আপ ক্রনিকল’-এর একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ লিখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে বাস করাটা কি আপনার লেখার ভেতরে কোনো প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে?

মুরাকামি: ‘দ্য উইন্ড আপ ক্রনিকল’ লেখার চার বছরে আমি আমেরিকায় ছিলাম একজন আগন্তুক হিসেবে। ঐ আগন্তুকে ব্যাপারটা আমাকে সবসময় তাড়া করেছে, উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রের ক্ষেত্রেও সেটা ঘটে। এখন ভাবতে পারেন, ওটা জাপানে লেখা হলে ভিন্ন একটা উপন্যাস হতো কিনা। আমার জাপানে অপরিচিত ভাবটা এখানকার থেকে ভিন্ন। আমেরিকায় এটা ছিল আরো তীব্র ও প্রত্যক্ষ তাই ওখানে আমার নিজেকে চিনতে সুবিধে হয়েছে। এই উপন্যাসটা লেখা নিজেকে নগ্ন করে দেখার মতোই।

জন: বর্তমানে জাপানে লিখছেন এমন কেউ আছেন যার লেখা আপনি পছন্দ করেন?

মুরাকামি: হ্যাঁ নিশ্চয় আছে। রু মুরাকামি। বানানা য়ুশোমিতো, তাঁর কিছু বই আমি পছন্দ করি। কিন্তু আমি কোনো সমালোচনা করি না। আমি ঐ কাজে নিয়োজিত হতে চাই না।

জন: তা কেনো?

মুরাকামি: আমি মনে করি, আমার কাজই হলো মানুষ এবং বিশ্বকে প্রত্যক্ষ করা। তাদের বিচার করা নয়। আমি সবসময় তথাকথিত উপসংহার টানা থেকে দূরে থাকি। আমি সবকিছু সব সম্ভাবনার কাছে আগলে রাখতে পছন্দ করি। এক্ষেত্রে সমালোচনার চেয়ে অনুবাদের কাজটা আমার পছন্দের। কেননা আপনাকে তখন আর কোনো বিচারের কাজে জড়ানোর দরকার পড়ে না। লাইন ধরে ধরে আমি আমার প্রিয় কাজকে আমার শিরার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত করি। সাহিত্যে সমালোচনার অবশ্যই দরকার আছে, তবে সেটা আমার কাজ না।

জন: আপনার কাজে ফিরে আসছি: আমেরিকান গোয়েন্দা গল্প হিসেবে ‘হার্ড-বয়েল্ড’ মূল্যবান সম্পদ। আপনি কখন এই ধারার সাথে অভ্যস্ত হলেন?

মুরাকামি: মাধ্যমিকে পড়ার সময় আমি ক্রাইম উপন্যাসের প্রেমে পড়ি। তখন ওবে বাস করতাম। এটা ছিল বন্দর শহর যেখানে বিদেশীরা আসতেন এবং তাদের পেপারব্যাক বইগুলো পড়া শেষ হলে পুরনো বইয়ের দোকানগুলোতে সস্তায় বিক্রি করে দিতেন। আমাদের অত টাকা পয়সা ছিল না। আমি ঐ বইগুলো সস্তায় কিনে পড়তাম। ঐ বইগুলো পড়ে পড়ে আমি ইংরেজি শিখেছি।

জন: আপনার প্রথম পড়া ইংরেজি বইয়ের নামটা মনে আছে?

মুরাকামি: আর্চার। রোজ ম্যাকডোনাল্ড-এর লেখা। ঐ বইগুলো থেকে অনেক শিখেছি। একবার শুরু করলে আর থামতে পারতাম না। একইসাথে আমি দস্তয়ভস্কি এবং তলস্তয় পড়তাম। সেগুলোও ধরলে না শেষ করে ওঠা যেত না। কাজেই আমার কাছে দস্তয়ভস্কি ও রেমন্ড চান্ডলার একই কথা। এমনকি এখনো আমার কাছে আদর্শ কথাসাহিত্য রচনা করা মানেই দস্তয়ভস্কি আর চান্ডলারকে একসাথে বেটে রান্না করা। সেটাই আমার লক্ষ।

জন: কোন বয়সে আপনি প্রথম কাফকা পড়লেন?

মুরাকামি: যখন পনের তখন ‘দ্য ক্যাসেল’ পড়েছিলাম, দারুণ একটা বই। তারপর ‘দ্য ট্রায়াল’।

জন: বেশ তো। দুটো উপন্যাসই অসমাপ্ত। মানে তাদের কোনো উপসংহার নেই। আপনার উপন্যাসেও কথাটা খাটে। এটাকে কি কাফকার প্রভাব বলা যেতে পারে?

মুরাকামি: পুরোপুরি নয়। আপনি নিশ্চয় চান্ডলার পড়েছেন। তাঁর বইও সমাপ্তি টেনে দেয় না। তিনি হয়ত বলে দেন, সেই হল খুনি, কিন্তু কে করলো সেটা আমার কাছে তেমন কোনো বিষয় নয়। সমাপ্তির কোনো অর্থ হয় না। ‘ব্রাদার কারমাজোব’-এ কে খুনি তার আমি পরোয়া করি না।

জন: তারপরও কে খুন করলো সেটা জানার জন্যই তো শেষ পর্যন্ত পড়ে যাওয়া?

মুরাকামি: আমি যখন লিখি আমি নিজেও জানি না কে করেছে। পাঠক এবং আমি একই অবস্থানে অবস্থান করি। যখন আমি কোনো গল্প লিখতে শুরু করি, আমি শেষটা মোটেও জানি না। আমি জানি না এর পরে কি ঘটতে যাচ্ছে। যদি শুরুতেই কেউ কাউকে মারে, আমি জানি না কে কাকে মারলো। আমি বইটি শেষ করি কারণ আমি শেষটা জানটা চাই। যদি আমি আগে থেকেই জানি কে খুন করলো, তাহলে আর গল্পটি লেখার মানে থাকলো না।

জন: আপনার গল্পটা ব্যাখ্যা করে না দেওয়ার পেছনে নিশ্চয় কোনো অর্থ আছে, যে কারণে স্বপ্ন ব্যাখ্যা করলে তার স্বপ্নময়তা থাকে না?

মুরাকামি: বই লেখার সবচেয়ে ভাল দিক হল, আপনি জেগেও স্বপ্ন দেখতে পারেন। যদি এটা প্রকৃত স্বপ্ন হয় তাহলে আপনি তা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবেন না। লেখার সময় আপনি জেগে আছেন কাজেই আপনি সময়, মাত্রা সবকিছু নির্ধারণ করে নিতে পারেন। আমি সকালে চার অথবা পাঁচ ঘণ্টা ধরে লিখি এবং ঐ সময় পার হলে আর লিখি না। পরদিন আবার শুরু করি। যদি এটা প্রকৃত স্বপ্ন হয় তাহলে আপনি সেটা পারবেন না।

জন: আপনি বললেন যে আপনি যখন লেখেন তখন খুনটা কে করলো সেটা জানেন না। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটেছে: ‘ড্যান্স ড্যান্স ড্যান্স’ উপন্যাসে সচেতনভাবেই ঐ দৃশ্যটির প্রতি ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যেখানে গোতেন্দা তার স্বীকারোক্তি প্রদান করে, অনেকটা ক্লাসিক ক্রাইম উপন্যাসের মতো। সেই শেষ ব্যক্তি যাকে আমরা সন্দেহ করতে পারি। আপনি কি শুরুতে জানতেন না যে গোতেন্দা ছিল অপরাধী?

মুরাকামি: প্রথম খসড়ায় আমি জানতাম না। শেষটার কাছাকাছি গিয়ে জানতে পারলাম। যখন দ্বিতীয়বারের মতো লিখতে বসলাম তখন গোতেন্দার দৃশ্যগুলো নতুন করে লিখলাম, জেনে যে গোতেন্দা মূল অপরাধী।

জন: এবার আপনার চরিত্রদের সম্পর্কে জানতে চাইবো। আপনি যখন লেখেন তখন কতটা বাস্তব মনে হয় তাদের? ন্যারেটিভে একমাত্র আপনিই জীবন্ত, এটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ আপনার কাছে?

মুরাকামি: আমি যখন আমার চরিত্রগুলো নির্মাণ করি, তখন আমার আশেপাশের মানুষগুলোকে ভালো করে দেখি। বেশি কথা বলি না, আমি অন্যদের গল্প শুনতে পছন্দ করি। তারা কেমন মানুষ হবে সেটা আমি নির্ধারণ করি না। তাদের ভাবনাটাকে ধরতে চেষ্টা করি। আমি জানি না এটা বাস্তবিক না অবাস্তবিক, তবে আমার কাছে আমার চরিত্ররা বাস্তবের চেয়েও বাস্তব। আমি যে ছয় বা সাত মাস ধরে লিখি, তখন চরিত্ররা আমার ভেতরে আবাস গাড়ে। এটা একটা নতুন জগতের মতোন।

জন: আপনার চরিত্ররা মাঝে মাঝে মনে হয় আপনার দৃষ্টিভঙ্গির প্রজেকশন।

মুরাকামি: একটু এভাবে ভাবুন নাÑ আমার যমজ ভাই আছে। যখন আমাদের দু’বছর বয়স তখন আমাদের একজন অপহৃত হল। বেশ কিছুদিনের জন্য অন্য কোথাও সরিয়ে রাখা হল। আমি মনে করি আমার কেন্দ্রীয় চরিত্র হল সেই। আমার নিজেরই অংশ কিন্তু আমি নয়। এবং বহুদিন আমাদের সাক্ষাৎ ঘটেনি। এটা আমারই আরেক রূপ। ডিএনএর হিসেবে আমরা একই, কিন্তু আমাদের পরিবেশ পরিস্থিতি ভিন্ন। কাজেই আমাদের চিন্তাটা ভিন্ন। যতবারই আমি কোনো বই লিখি ততবারই আমি আমার পা দুটো অন্য জুতোয় রাখি। কারণ কখনো কখনো নিজের ভেতর থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠি। এইভাবে আমি সেখান থেকে পালাতে পারি। এটা ফ্যান্টাসি। যদি আপনার কোনো ফ্যান্টাসিই না রইল তাহলে কেন লিখবেন!

জন: আপনার উপন্যাসে দুই ধরনের নারীদের দেখা যায়: একধরনের নারীদের সাথে আপনার প্রটাগনিস্ট-এর সত্যিকার সম্পর্ক থাকে। প্রায়ই এ ধরনের নারীরা লীন হয়ে যায় এবং তার স্মৃতি তখন প্রটাগনিস্টকে তাড়িয়ে বেড়ায়। অন্য ধরনের নারীরা পরে আসে, হয় প্রটাগনিস্টকে নতুন করে কিছু খুঁজতে সাহায্য করতে নয়ত ভুলিয়ে রাখতে। দ্বিতীয় টাইপের নারীরা অকপটে হয়, যৌনতার দিক দিয়ে উদার। এই দুই ধরনটা আসলে কেন?

মুরাকামি: আমার প্রটাগনিস্ট সবসময় বাস্তব ও আধ্যাত্মিক জগতে আটকে থাকে। আধ্যাত্মিক জগতে নারী অথবা পুরুষরা খুব শান্ত, বুদ্ধিমান ও ভদ্র। কিন্তু বাস্তব জগতে, আপনি যেমনটি বললেন, নারীরা খুব সচল, হাস্যমুখর ও আশাবাদী। তাদের হিউমরটা ধরার ক্ষমতা রয়েছে। প্রটাগনিস্ট-এর মন এই দুই জগতে বিভক্ত থাকে। তিনি ভেবে পান না কোনটা ধরে রাখবেন। আমার মনে হয় সেটিই প্রধান উদ্দেশ্য।

‘হার্ড বয়েলড ওয়ান্ডারল্যান্ড’ উপন্যাসে বিষয়টি খুব দৃশ্যগত। সেখানে প্রটাগনিস্ট-এর মনটা বিভক্ত। ‘নরওয়েজিয়ান উড’ উপন্যাসে দুই জন নারী আছে, প্রটাগনিস্ট শেষ অবধি ভেবে পায় না কাকে আঁকড়ে ধরবে।

জন: আপনি কি আপনার কমিক চরিত্রগুলোর প্রতি বেশি যতœবান?

মুরাকামি: আমি কমিক ডায়লগ লিখতে পছন্দ করি। এটা আমাকে মজা দেয়। কিন্তু আমার সব চরিত্র যদি কমিক হয় তাহলে মজাটা খুব একঘেয়েমি হয়ে যাবে। কমিক চরিত্রগুলো আপনার মনকে থিতিয়ে রাখবে। হাসিটাকে আপনাকে জিইয়ে রাখতে হবে। আপনি যখন বিষণœ থাকবেন তখন আপনার ভেতরটা ঢেউ খেলে যাবে। কিন্তু যখন আপনি হাস্যউজ্জল থাকবেন আপনি তখন স্থির। তবে আপনি হাসি দিয়ে তো আর যুদ্ধ জয় করতে পারেন না!

জন: আপনাকে মনে করা হয় আমেরিকান-জাপানি লেখক। কিংবা জাপানের বর্তমান লেখকদের ভেতর আপনাকে সবচেয়ে পশ্চিমা ঘেঁষা বলা হয়ে থাকে। আমি জানতে চাচ্ছিলাম, জাপানের সংস্কৃতির সাথে আপনার বোঝাপড়াটা কেমন?

মুরাকামি: আমি অন্যদেশে থেকে ঐদেশের মানুষদের নিয়ে লিখি না। আমি আমাদের নিয়ে লিখতে চাই। আমি আমার জাপান ও জাপানের মানুষদের জীবন নিয়ে লিখতে চাই। অনেকে বলেন যে আমার ধরনটা পশ্চিম বিশ্বের জন্য যুতসই, সেটা হয়ত ঠিক, তবে আমার গল্পগুলো একান্তই আমার, সেগুলো পশ্চিমা না।

জন: আপনার লেখায় প্রসঙ্গক্রমে পশ্চিমের অনেক বিষয় চলে আসে। উদাহরণস্বরূপ বিটলস-এর কথা বলা যায়, এখন সেটা জাপানের জীবনের সাথেও জড়িয়ে গেছে।

মুরাকামি: যখন আমি লিখি যে মানুষ ম্যাকডোনাল্ডের হাম্বাগার খাচ্ছে, আমেরিকানরা বিস্ময় নিয়ে তাকায়, তারা ভাবে এই চরিত্র টফু না খেয়ে হাম্বাগার খাচ্ছে কেন! কিন্তু হাম্বাগার খাওয়াটা এখানে এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।

জন: আপনি কি বলবেন যে আপনার উপন্যাসগুলো জাপানের নাগরিক জীবনকে যথাযথভাবে উঠিয়ে আনে?

মুরাকামি: যেভাবে মানুষ কথা বলে, যেভাবে তারা প্রতিক্রিয়া জানায়, যেভাবে তারা চিন্তা করে, যেভাবে তারা বিশ্লেষণ করে, এসব অতি মাত্রায় জাপানি। কোন জাপানি পাঠকই অভিযোগ করে জানাতে পারবে না যে আমার গল্প তাদের জীবন থেকে একেবারে আলাদা। আমি জাপানিদের নিয়েই লিখতে চাই। কোথায় আমরা আছি, আমাদের গন্তব্য কোথায়, আমরা আসলে কে আমি এগুলো নিয়েই লিখতে চাই। এগুলোই আমার লেখার বিষয়বস্তু বলে আমি মনে করি।

জন: ‘দ্য উইন্ড আপ বার্ড ক্রনিকল’ এর কথা বলতে গিয়ে আপনি আপনার বাবার কথা স্মরণ করেছেন। আপনার উপন্যাস কিংবা ছোটগল্পে তাকে ততো আমরা পাই না।

মুরাকামি: আমার প্রায় সব উপন্যাসই প্রথম পুরুষে লেখা। আমার প্রধান চরিত্রের কাজ হল তার চারপাশে যা ঘটে সেটা অবলোকন করা। তার যেটা দেখার কথা সে সেটা দেখে। যদি আমি বলি যে সে গ্রেট গেটসবির নিক কারাওয়ের সাথে মিলে যায়, সে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ। তার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্যে তাকে সব ধরনের সম্পর্ক থেকে দূরে থাকতে হবে।

এইভাবে জাপানের ঐতিহ্যবাহী সাহিত্যে পরিবার সমস্তটার ওপর গুরুত্ব বহন করে এসেছে। আমি আমার প্রধান চরিত্রকে স্বাধীন ও সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে উপস্থাপন করতে চাই। নগরবাসী হিসেবে তার অবস্থানটা ঐরকমই ছিল। তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন যিনি সম্পর্ক ছেড়ে স্বাধীনতা ও এককীত্বকে বেছে নিয়েছিলেন।

জন: জাপানি উপকথার উপস্থিতি আপনার সাহিত্যে কতখানি?

মুরাকামি: যখন ছোট ছিলাম, আমাকে অনেক উপকথা শোনানো হতো। আপনি যখন বড় হয়ে যাবেন তখন ঐ গল্পগুলো আর বিনোদনের থাকে না। উদাহরণস্বরূপ, অতিব্যাঙয়ের চরিত্রটি তেমনই কোন গল্প থেকে চলে আসবে। আজকাল গল্প লেখার জন্যে ন্যারেটিভটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি তত্ত্ব নিয়ে তেমন মাথা ঘামায় না। শব্দ ভা-ার নিয়েও খুব একটা পড়ে থাকি না। গুরুত্বের বিষয় হল ন্যারেটিভটা ভাল না মন্দ। ইন্টারনেটের ফলে আমাদের এখন নতুন এক ধরনের লোকসংস্কৃতির সাথে সাক্ষাৎ ঘটছে। এটা এক ধরনের মেটাফর। আমি ম্যাট্রিক্স ছবিটি দেখেছি। এটা এখনকার মানুষদের জন্যে একটা ফোকলোর। কিন্তু এখানকার সকলে বলেছে যে এটা খুব একঘেয়ে।

জন: আপনি কি হায়া মিয়াজাকির এনিমেটেড ‘স্পিরিটেড এ’ওয়ে’ মুভিটি দেখেছেন? আমার কাছে মনে হয়েছে ঐ মুভিটার সাথে আপনার উপন্যাসের তুলনা চলে। তিনি আপনার মতো ফোকলোরকে আধুনিককালের উপযোগী করে পরিবেশন করেন। আপনার কেমন লাগে ?

মুরাকামি: না। আমি এনিমেটেড মুভি দেখি না। ঐ ছবিটার হালকা একটা অংশ আমি দেখেছিলাম। ওটা আমার ধরন না। ওই ধরনের বিষয়বস্তুর ওপর আমার তেমন আগ্রহ নেই। আমি যখন লিখি, তখন একটা চিত্রকল্প তৈরি করি। সেই চিত্রকল্পটি যথেষ্ট মজবুত।

জন: আপনি একটু আগে বললেন যে হাস্যরস পাঠকদের ধরে রাখে। এটা কি আর কোনো কাজে আসে?

মুরাকামি: মাঝে মধ্যে আমি আমার পাঠকদের হাসাতে চাই। জাপানের অনেক পাঠক আমার বই ট্রেনে বসে পড়ে। মধ্যবিত্ত জাপানিরা কর্মক্ষেত্রে আসা-যাওয়া দিয়ে দুঘণ্টার বেশি সময় ট্রেনে পার করে, সে সময় তারা পড়ে। সেই জন্যে আমার বইগুলো সাধারণত দুই খ-ে প্রকাশিত হয়, একখ- বয়ে বেড়ানো মুশকিলের ব্যাপার। কিছু কিছু মানুষ অভিযোগ জানিয়ে আমাকে চিঠি লেখেন যে তারা যখন ট্রেনে আমার বই পড়েন তখন না হেসে থাকতে পারেন না, এতে তারা বেশ বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখীন হন। তাদের অভিযোগ আমাকে অনুপ্রেরণা দেয়। আমার বই পড়ে মানুষ হাসছে ভেবে বেশ মজা পাই। আমি প্রতি দশ পৃষ্ঠা অন্তর অন্তর তাদের হাসাতে চাই।

জন: এটা কি আপনার কোনো গোপন পরিকল্পনা?

মুরাকামি: এটা ওইভাবে ভেবেচিন্তে হয় না। আমি কার্ট ভন্গুট এবং রিচার্ড ব্রাটিগান পড়তে পছন্দ করতাম। তাদের লেখা ছিল হিউমারে ভরা, তবে বিষয়বস্তু সিরিয়াস। আমি ঐধরনের বই পড়তে পছন্দ করি। যখন প্রথম তাদের পড়ি তখন ঐ ধরনেরও বই লেখা হয় ভেবে আশ্চর্য হয়েছিলাম। নতুন জগৎ আবিষ্কারের মতোই মধুর ছিল বিষয়টা।

জন: আপনি কি তাহলে ঐ ধরনটাকে বেছে নিয়েছিলেন?

মুরাকামি: আমার মনে হয়, এই পৃথিবীটাই হল একটা কমেডি। এই নগর জীবন, এক টেলিভিশনে পঞ্চাশটি চ্যানেল, সরকারের ঐ বোকা লোকগুলো, সব কমেডি। কাজেই আমি সিরিয়াস হতে চেষ্টা করি, যত চেষ্টা করি ততই যেন কমিক্যাল হয়ে পড়ি। ১৯৬৮-৬৯ এর দিকে আমরা ভয়ংকর সিরিয়াস ছিলাম, তখন আমি নবম শ্রেণিতে পড়ি। মানুষজন তখন খুব ভাববাদী ছিল।

জন: এজন্য বোধহয় আপনার ঐ সময়ের প্রেক্ষাপটে লেখা ‘নরওয়েজিয়ান উড’ সবচেয়ে কম কমিক্যাল। জাদুবাস্তবতার অন্যতম শর্ত হল জাদু বা অতিবাস্তব বিষয়বস্তুর ওপর কম মনোযোগ দেওয়া। যদিও আপনি সেই নিয়ম মানেন বলে মনে হয় না। আপনার চরিত্র আপনার গল্পের অদ্ভুত দিকগুলো নিয়ে অস্বস্তিতে ভোগে, পাঠকদের সেখানে আটকে রাখে। এটা কেন? এর কি আলাদা কোনো মতলব আছে?

মুরাকামি: বেশ মজার প্রশ্ন এটি। আমার মনে হয় পৃথিবীটা কতটা অদ্ভুত, কতটা মজার সে বিষয়ে এটা আমার সৎ পর্যবেক্ষণ। আমি লিখতে লিখতে যে সকল অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যায়, আমার চরিত্ররাও সেই সকল অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যায়। এবং যখন পাঠকরা পড়ে তারাও তখন একই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যায়। কাফকা এবং মার্কেজ যেটা লিখেছেন সেটা ধ্রুপদী সাহিত্যের বিবেচনায় অতিসাহিত্য। আমার গল্পগুলো অতিবাস্তব একইসাথে অতিবর্তমান ও অতিআধুনিক। একটা মুভি সেটের কথা চিন্তা করুন যেখানে সবকিছুÑ ক্যামেরা, বই, বই রাখার আলনা সব নকল। দেয়ালটি কাগজের তৈরি। ধ্রুপদী ধাঁচের জাদুবাস্তবতায় ঐ দেয়াল ও বইগুলো বাস্তব। আমার সাহিত্যে নকল বলে যদি কিছু থেকে থাকে আমি বলে দিই যে এটা নকল। আমি সেটাকে আসল বলে ভান করি না। আমি পাঠকদের নকলকে আসল বলে বিভ্রান্তের ভেতর ফেলি না। এক অর্থে, আমি পাঠকদের বলতে চাই, এটা শুধু গল্প মাত্র। এটা বানানো। কিন্তু যখন আপনি নকল জিনিসকে আসল জ্ঞান করবেন, তখন সেটা আসল হয়েও যেতে পারে। বিষয়টা আসলে এত সহজে বোঝাবার নয়।

উনবিংশ ও বিংশ শতকের গোড়ার দিকে, লেখকরা আসল জিনিস উপস্থাপন করতেন। সেটাই ছিল তাদের কাজ। ‘যুদ্ধ এবং শান্তি’ তে তলস্তয় যুদ্ধময়দানকে এতকাছ থেকে বর্ণনা করেছেন যে পড়তে পড়তে পাঠক ওটাকে বাস্তব বলে ধরে নিতে বাধ্য। কিন্তু আমি তা করি না। আমি ভান করছি না। আমরা বানানো পৃথিবীতে বাস করছি। আমরা সন্ধ্যায় বানানো খবর শুনি। আমরা একটা বানানো যুদ্ধে যুদ্ধ করছি। আমাদের সরকার বানানো। তবে আমরা এই বানানো জগতে আমাদের বাস্তবতাকে খুঁজে পাই। আমার গল্পগুলো ঐরকম। আমরা বানোয়াট দৃশ্যের ভেতর দিয়ে গমন করছি। তবে যখন আমরা এই বানোয়াট জগতের ভেতর দিয়ে হাঁটছি তখন ওটা আমাদের কাছে বাস্তব হয়ে উঠছে। প্রতিশ্রুতি ও সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতিটা বাস্তব। এটাই আমি লিখতে চাই।

জন: আপনি আপনার লেখায় সময়টাকে বার বার ধরিয়ে দেন।

মুরাকামি: পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনায় যেতে পছন্দ করি। তলস্তয় সামগ্রিক বিবরণকে তুলে আনতে চেয়েছিলেন। আমার বিবরণ খুব খুদে একটা অংশকে ঘিরে থাকে। আপনি যখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জিনিসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে উপস্থাপন করবেন, তলস্তয়ের বিপরীতটা তখন ঘটবে, বিষয়টা তখন অবাস্তবিক হয়ে যাবে। এটা যত কাছে আসে তত অবাস্তব হয়ে ওঠে। এটাই আমার স্টাইল।

জন: আপনি একটু আগেই কাফকা ও মার্কেজের সাথে নিজেকে আলাদা করলেন। বললেন তারা সাহিত্যের লেখক। আপনি কি তবে নিজেকে সাহিত্যের লেখক বলে ভাবছেন না?

মুরাকামি: আমি চলমান সময়ের সাহিত্যিক। এই সময়ের সাথে তাঁদের একটা পার্থক্য আছে। যখন কাফকা লিখতেন তখন খালি সঙ্গীত, বই আর থিয়েটার ছিল। এখন আমাদের সিনেমা ও ইন্টারনেটসহ আরও অনেককিছু হয়েছে। এখন প্রতিযোগিতা বেড়ে গেছে বহুগুণে। সময়টা হল বড় সমস্যা। উনবিংশ শতকে অবসর কাটানোর মতো যথেষ্ট সময় ছিল। কাজেই তারা বই পড়তো। তারা অপেরা হাউজে তিন থেকে চার ঘণ্টার জন্যে বসে পড়তো। কিন্তু এখন সবাই খুব ব্যস্ত। অবসর বলে কিছু নেই জীবনে। ‘মবি ডিক’ কিংবা দস্তয়ভস্কি পড়া সত্যিই আনন্দের, কিন্তু মানুষের ওত সময় কোথায়! কাজেই কথাসাহিত্যকে বদলাতে হয়েছে। আমাদের পাঠকদের এখন ঘাড় ধরে টেনে নিয়ে আসতে হয়। এই সময়ের কথাসাহিত্যিকরা জ্যাজ কিংবা ভিডিও গেমসের মতো অন্যান্য জগদের রীতি অনুসরণ করছেন। আমার ধারণা, ভিডিও গেমস এখন কথাসাহিত্যের সবচেয়ে কাছাকাছি একটি মাধ্যম।

জন: ভিডিও গেমস?

মুরাকামি: হুম। যদিও আমি নিজে ওটা খেলা বিশেষ সুবিধার মনে করি না। তবে এই মিলটা আমি ধরতে পারি। মাঝে মধ্যে লেখবার সময় আমার মনে হয়, আমি একটি ভিডিও গেমের নকশা তৈরি করছি, সাথে ওটা চালানোর একটি মাধ্যমেরও। আমি প্রোগ্রামটা তৈরি করেছি, এখন আমি সেটার মাঝখানে; আমার বাম হাত জানে না ডান হাত কি করছে। এটা এক ধরনের ব্যবচ্ছেদ, বিচ্ছেদের অনুভূতি।

জন: বিষয়টাকে কি এভাবে দেখা যায় যে, আপনি যখন লিখছেন তখন জানেন না এর পরে কি ঘটতে যাচ্ছে, আবার আপনার একটা অংশ ঠিকই জানে এর ভবিষ্যতটা?

মুরাকামি: অবচেতনভাবে হতে পারে। যখন আমি লেখার ভেতর ডুবে থাকি, আমি জানি লেখক কি অনুভব করছেন এবং পাঠক কি ভাবছেন। সেটা ভাল, এ থেকে আমি লেখার গতি সঞ্চার করি। কেননা আমিও পাঠকদের মতো জানতে চাই পরের ঘটনাগুলো। তবে আপনাকে কখনো কখনো স্রোতকে টেনে ধরতে হবে। যদি আপনি খুব দ্রুত হাঁটেন, পাঠকরা ক্লান্ত ও একঘেয়ে হয়ে উঠবে। পাঠকদের একটা নির্দিষ্ট জায়গায় আপনাকে থামাতে হবে।

জন: থামানোর কাজটি আপনি কিভাবে করেন?

মুরাকামি: আমি এটা অনুভব করি মাত্র। আমি যখন বুঝতে পারি এখন থামা উচিৎ, থেমে যাই।

জন: জ্যাজ মিউজিকের প্রসঙ্গতে আসছি। সঙ্গীত আপনাকে কতটা সাহায্য করে?

মুরাকামি: তের চোদ্দ বছর বয়স থেকে আমি জ্যাজ শুনে অভ্যস্ত। আমি সঙ্গীত শিল্পী হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কোনো বাদ্য ঠিকঠাক বাজাতে পারতাম না। তাই লেখক হয়ে গেলাম। বই লেখা বাদ্য বাজানোর মতোই: প্রথমে আমি ভাবনাটাকে বাজাই, তারপর সেটাকে ঠিকঠাক করতে করতে ইতি টানি।

জন: ‘কাফকা অন দ্য সোউর’ বইটি সম্পর্কে যদি কিছু বলেন?

মুরাকামি: এটা আমার লেখা সবচেয়ে জটিল একটি বই। এটাকে আসলে ব্যাখ্যা করে বোঝানো মুশকিল।

এখানে দুইটা গল্প একইসঙ্গে ঘটে চলে। আমার প্রটাগনিস্ট পনের বছরের বালক, তার নাম কাফকা। অন্যগল্পে প্রটাগনিস্ট ষাট বছরের বৃদ্ধ। তার কোনো অক্ষর জ্ঞান নেই। সে খুব উজবুক প্রকৃতির। তবে সে বেড়ালের সাথে কথা বলতে পারে। কাফকাকে তার বাবা অভিশাপ দেন, খানিকটা ওডিপাসের সেই অভিশাপের মতো: তুমি তোমার বাবাকে খুন করবে এবং মার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবে। সে তার অভিশাপ থেকে বাঁচতে বাবার কাছ থেকে পালিয়ে যায়। সে অদ্ভুুত একটা জায়গায় এসে পৌঁছায়। সেখানে সে অবাস্তব, স্বপ্নতুল্য সব ঘটনার সাক্ষাৎ পায়।

জন: গঠনের দিক থেকে এটি ‘হার্ড বয়েলড ওয়ান্ডারল্যান্ড এন্ড ইন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ এর মতোই?

মুরাকামি: ঠিক তাই। শুরুতে আমি ‘হার্ড বয়েলড ওয়ান্ডারল্যান্ড’-এর সিকুয়েল লিখতে চেয়েছিলাম, পরে ভেবে ঠিক করলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু লিখবো। তবে দেহটা একই। আত্মাটাও এক। গল্পের বিষয়বস্তু হল এই জগত আর আরেকটা জগত; আপনি কিভাবে এই দুই জগতের ভেতর যাতায়াত করেন সেটাই।

Related Posts

About The Author

Add Comment