হুমায়ূন আহমেদের হিমু এবং আমাদের আশিষ স্যার

কুমিল্লার রামচন্দ্রপুরে অধ্যাপক আব্দুল মজিদ কলেজে আমাদের বাংলার শিক্ষক আশিষ কুমার গুহ নিজে হিমু টাইপ হলেও হুমায়ূন আহমেদকে দুচোখে দেখতে পারতেন না। তিনি বারবার তার গুরু হুমায়ুন আজাদের কথা বলতেন। হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে তীব্র আগ্রহ তৈরির পেছনে আশিষ স্যারের প্ররোচনা দায়ী এটা বলা যায় নি:সন্দেহে।

মুখে যতই হিমু ও তার স্রষ্টা হুমায়ূন আহমেদকে গালি মারুক না কেন তিনি কলেজে ছিলেন হিমুর মতই জনপ্রিয়। কলেজ হোস্টেলের সব ছাত্রদের কাছে তিনি ছিলেন ‘গুরু’। এই ব্যাচেলর শিক্ষক(২০০৬ পর্যন্ত!) হিমুকে পছন্দ না করলেও জীবনধারায় ছিলেন হিমুর মত। একবার দেখা গেল কলেজ হোস্টেলের সবার মাথা ন্যাড়া! খোঁজ নিয়ে জানা গেল যে গুরুর আদেশ তামিল করতে ঐ হোস্টেলের প্রায় সবাই ন্যাড়া হয়ে গেল। আশিষ গুহের প্রভাবটা অনেকটা হিমুর মতই ছিল। তিনি জোর করতেন না। কিন্তু ছাত্ররা কেন যেন তার ভক্ত হয়ে যেত এবং তার বোহেমিয়ান জীবন যাপনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যেত।

একবার হয়েছি কি এক জ্যোৎস্না ভরা মধ্যরাতে হাঁটা শুরু করলেন তার এক প্রিয় শিষ্যের কাছে যে পাগল হয়ে গিয়েছিল। আমাদেরই কলেজের সে ছাত্রটি পাগল হয়ে যাওয়ার পর ‘গুরু’ ‘গুরু’ প্রলাপ বকছিল। মা বাবা ‘গুরু’ কে গরু মনে একটি গরু দান করার মান্নত করে এবং দান করে দিয়েছিলেন! মনে করেছিল কোন গরু দান করলে হয়তো তাদের ছেলে সুস্থ হয়ে যাবে। কিন্তু আসলে ‘গুরু’কে খুঁজছিল ছেলেটি। কিভাবে এই খবর আশিষ গুহের কানে যায় এবং ঐদিন রাতেই হাঁটা শুরু করেন তার প্রিয় শিষ্যকে দেখার জন্য।

প্রায় ১৫ কিমি বা এর থেকে দূরে শিষ্যের বাড়ি। জ্যোৎস্নারাতে হাঁটতে হাঁটতে পৌছে যায় শিষ্যের বাসায়। আশিষ স্যারকে সঙ্গ দেয়ার জন্য ছিল আরও আট দশজন শিষ্য! সারারাত হেঁটে ভোরবেলায় শিষ্যের বাড়িতে পৌছে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন আশিষ স্যার। তার মাঝে হিমুর মত তাক লাগিয়ে দেয়ার মত একটা ব্যাপার আছে এটা বলাই বাহুল্য!

হিমু একজন প্রতি বিপ্লবী। বিপ্লবী হতে পারার ব্যর্থতা থেকে এই অবস্থানে চলে আসে হিমু। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন-স্বপ্ন হরণ, রাজনীতি মনস্কতা আবার রাজনীতি বিমুখতার সার্থক চিত্রায়ন হিমু। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে হিপ্পি ও পপ জেনারেশনের আবির্ভাব ঘটেছিল। যারা প্রচলিত ধর্ম, রীতি নীতি, রাষ্ট্র, সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিল। বিশেষ করে যুদ্ধের ভয়াবহতার ভুক্তভোগি তরুণ প্রজন্ম ঐ সব ব্যবস্থার প্রতি আর অনুগত ছিলনা। তারা আবার অস্ত্র হাতে নিয়ে এর প্রতিবাদ করতে যায়নি। তাদের ঐ বিদ্রোহের প্রকাশ ঘটেছিল তাদের পোশাক আশাকে, আচার আচরণে, জীবন ধারায়। তখন পপগান, ডিসকো, জিন্স প্যান্ট, মাদক সেবন, সমকামিতা ফেনোমেনা আকারে হাজির হয়। আমাদের এখানেও এর ঢেউ লেগেছে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে। যে মহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে লাখো মানুষ জীবন দিয়েছিল স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তাদের আশা আকাঙ্খা, স্বপ্নের পতন ঘটে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তাদের এ হতাশার প্রকাশ ঘটতে থাকে মাদকাসক্তিতে, সন্ত্রাসি কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার মাধ্যমে। তখনকার সংগীত ও কবিতায় এর উত্তাপ খানিকটা পাওয়া যায়।

সমাজ, জাতি, রাষ্ট্র ও বিশ্ব পাল্টে দেয়ার মহান সংগ্রামে অংশগ্রহণ করা তরুণ যখন তাদের স্বপ্ন ভেঙ্গে যেতে থাকে তখন এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে কিছু ভয়েস দাড়ানোর কথা ছিল। হিমু হচ্ছে সেরকম একটি ভয়েস। হিমুকে মধ্যবিত্তের ক্ষয়ে যাওয়া আকাঙ্খার বিকারও বলা যায় অনেক ক্ষেত্রে।

রাজনীতির একজন ছাত্র এবং ভবিষ্যত নিয়ে আশাবাদী তরুণ প্রজন্মের একজন হিসেবে হিমুকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে পারিনা। কিন্তু হিমুর এরকম কাব্যিক জীবনের ছন্দময় প্রকাশকে প্রশংসা করতে কার্পণ্যও করতে পারি না!

Related Posts

About The Author

Add Comment