লেকচার নোট: অসমাপ্ত আত্মজীবনী

(লেকচার নোট )

৯৪ তম পাবলিক লেকচার

 

বিষয়: শেখ মুজিবুর রহমানের “অসমাপ্ত আত্মজীবনী”

 

বক্তা: রওনক জাহান

মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আয়োজনেঃ বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

 

“আমি হিমালয়ের পর্বতমালা দেখিনি, কিন্ত আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি, ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতায় এই মানুষ-ই হিমালয়।এই ভাবে আমার হিমালয়ও দেখা হয়ে গেল।“

…………………কিউবার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতা ফিদেল কাস্রো ১৯৭৩ সালে নেম-এর চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলনে আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ারসে শেখ মুজিবুর রহমান কে উদ্দেশ্য করে এ কথাটি বলেন।

 

১। শেষ কথন

হিমালয় উচ্চতা সম্পন্ন এমন একজন মানুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ।অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে রয়েছে তাঁর গঠনশৈলী বক্তব্য,মর্ম ব্যাথা। তিনি রাজনীতির কবি বা poet of politics। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনীমূলক রচনা “জীবনস্মৃতি” –তে লিখেছেন যখন তাঁর জীবনের ২৬ বছরের কর্ম সবে শেষ করেছেন।তাকে সম্পূর্ণ ভাবে জানতে হলে ভ্রমন করতে হবে তাঁর সৃষ্ট গল্প, নাটক,উপন্নাস অথবা কাব্যগ্রন্থে। লেখক তার আত্মজীবনী যেখানে শেষ করেছেন সেটিও পূর্ব বাংলার রাজনীতি তে একটি গুরুত্তপূর্ণ অধ্যায়।পূর্ব বাংলায় তখন পাকিস্তানি শাসকদের শাসন প্রবর্তিত হয়েছে, ৯২ক ধারা জারি হয়েছে, বঙ্গবন্ধু কে জেলে নেওয়া হয়েছে। অনেকটা সময় কারাভোগের পর তিনি জেল থেকে বেরিয়ে দেখেন পূর্ব বাংলার মানুষের উপর হত্যা নিপীড়ন চলছে। সিদ্ধান্ত নেন কিছু একটা করতে ই হবে এবার!

বিচ্ছিন্ন ভাবে এতকাল যে প্রতিবাদ আন্দোলন চলছিলো, আর তা নয়। একটি বিশাল মঞ্চ গড়ে তুলতে হবে।তিনি লক্ষ্য করলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কর্মকাণ্ড কে। যিনি যুক্তফ্রন্টের আদর্শ এবং উদ্দেশ্য কে মান্য না করে বিপরীতে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। আর এ জন্য শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার জন্য প্রস্তুত হয়েছেন। এটি তাঁর জীবনে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

একটু উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের মত ব্যক্তিকেও তিনি সমালোচনা করে বাস্তবতার সম্মুখে দাড় করিয়ে দিয়েছেন।যতখানি রাজনৈতিক দৃঢ়তা এবং চেতনার প্রয়োজন তা ই শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে ছিল। ঠিক এই জায়গাটিতে ই অসমাপ্ত আত্মজীবনীর শেষ হয়।

 

 

 

২) অন্যান্য গ্রন্থ

  • আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার- উপর বঙ্গবন্ধুর লিখা রয়েছে যা একসময় প্রকাশিত হবে,
  • “স্মৃতির পাতা থেকে “ – এ শিরোনামটি বঙ্গবন্ধু নিজে ই দিয়েছেন…। এ বইটি ও একসময় প্রকাশিত হবে
  • *চীন ভ্রমন নিয়ে ও বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, এটা ও একসময় প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

 

৩) জীবনপঞ্জি

১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ। বাবা- শেখ লুতফর রহমান, মা- মুসাম্মাত সায়েরা খাতুন,। শিক্ষা জীবন শুরু করেন গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে,    ১৯৪২ সালে গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এই মিশনারি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে অর্থাৎ ১৯৩৮ সালে সর্ব প্রথম কারাভোগ করেন। ১৯৩৯ সালে হোসেন শহিদ সোহরাওয়ারদীর সম্মতিতে গোপালগঞ্জ মুসলিম ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগ গঠন করেন এবং তিনি সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪২ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন এবং কলেজের বেকার হোস্টেলের ২৪ নাম্বার কক্ষে তিনি থাকতেন। ১৯৪৭ সালে ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন, তারপর ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৮ সালে ৪ জানুয়ারী অন্যতম সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ । ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা লাভের পর তিনি যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৯ সালে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করায় বিশ্ববিদ্যালয় কত্রিপক্ষ তাকে বহিস্কার করে।  ১৯৫২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তিনি কারাগারে অনশন করেন। ১৪ ই মে ১৯৫৪ সালে গোপালগঞ্জ আসনে নির্বাচিত হয়ে তিনি যুক্তফ্রন্ট সরকারের সর্ব কনিষ্ঠ মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং কৃষি,বন,সমবায় ও পল্লী মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহন করেন। ১৯৫৬ সালে প্রাদেশিক সরকারের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৪ সালে বঙ্গবন্ধুর নেত্রিত্তে সম্মিলিত বিরোধী দল হিসেবে কমবাইন্ড অপজিসন পার্টি গঠন করা হয়, ১৯৬৬ সালে আওয়ামীলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ তে ছয় দফা উত্থাপন, ১৯৬৮র ৩ জানুয়ারী তে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ১ নম্বর আসামী হন। ’৬৯ এর ২২ ফেব্রুয়ারী মামলা থেকে মুক্তি পান এবং ২৩ ফেব্রুয়ারী রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ারদি উদ্যান) তৎকালীন ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদ কর্তৃক “বঙ্গবন্ধু” উপাধি লাভ করদান)। ১৯৬৯ এর ৫ ডিসেম্বর তিনি পূর্ব পাকিস্তানের নাম “বাংলাদেশ” নামকরণ করেন। ১৯৭০ এর নির্বাচনে তাঁর নেত্রিত্তে জাতীয় পরিষদে আওয়ামীলীগ পূর্ব পাকিস্তানে ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান ,২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ১০ এপ্রিল অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হন। ৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান সরকার কর্তৃক দেশদ্রোহী ঘোষণা করে তার মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারী তিনি পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন।ঢাকায় আসার পথে ৯ জানুয়ারী লন্ডনে  ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং দিল্লীতে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করেন।  ১০ জানুয়ারী বাংলাদেশে পৌঁছান । ১২ জানুয়ারী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন । ২৫ জানুয়ারী ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাদ্ধমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন।  ১৫ আগস্ট ভোরে বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিজ বাসভবনে সেনাবাহিনীর কতিপয় বিশ্বাসঘাতক অফিসার দের হাতে নিহত হন।

 

৪) বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব

এ বইটিতে শেখ মুজিবের পাশাপাশি আর একটি মানুষের উপস্থিতি উপলব্ধি করা যায় । লেখক যাকে রেণু বলে সম্ভোধন করেছেন আগাগোড়া অন্তরশিল ভাবে এ মহীয়সী নারীর কথা আলোকপাত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কে তাঁর জীবনের সমস্ত প্রেম, ভালবাসা,প্রীতি এবং সেই ভালবাসা প্রীতি কে দেশ প্রীতি এবং মানুষের প্রীতিতে রূপান্তরিত করে তিনি কতটা ত্যাগ স্বীকার করেছেন তা প্রতিটি নারীর জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আগ্রা থেকে লেখক যখন বাড়ি ফিরলেন তখন শুধু বিছানা নিয়ে ই ফিরতে পেরেছেন। কারন প্রায় সব কাপর চোপর চুরি হয়ে গেছে। প্রথমত টাকা পয়সার অভাব তারপর নতুন করে কাপর চোপর ও কিনতে হবে। ঠিক এই সময়ে আবার কলকাতা যাবার সময় রেনুর কাছে বিদায় নিতে গেলে দেখেন রেনু হাতে কিছু টাকা নিয়ে দাড়িয়ে আছেন। প্রিয় মানুষটিকে বিদায় দিতে কষ্ট হলেও তিনই তা বুঝতে দিতেন না।লেখকের ভাষায় “অমঙ্গল অস্রুজল বোধ হয় অনেক কষ্টে বন্ধ করে রেখেছে। শুধু বলল- একবার কলকাতা গেলে আর আসতে ই চাও না, এবার কলেজ ছুটি হলে বাড়ি এসো”।

৭ মার্চ ভাষণ দেয়ার আগে চিন্তিত বঙ্গবন্ধু কে বেগম মুজিব বলেছিলেন “আল্লাহর নাম নিয়ে তোমার মন –দিল- অন্তর থেকে যা আসে তা ই বলে দিও”।

নদীর পাড়ে যেমন স্বরণরেনু পড়ে থাকে ঠিক তেমন ই এ বইটির ভিতর শেখ ফজিলাতুন্নেসা মজিবের ছায়া ছড়িয়ে আছে।

লেখার অনপ্রেরনা ফজিলাতুন্নেসা মুজিব।বঙ্গবন্ধু জেল থেকে ফেরার পর খাতা গুলো আসছে কিনা সব সময় তা খেয়াল করতেন তিনি।১৯৭১ সালে শেখ হাসিনার ফুপাত বোন যিনি আরামবাগে থাকতেন তিনি মুরগির ঘরের চালার সাথে বেধে রাখতেন যাতে কেউ সন্দেহ না করে।

 

৫) অপূর্ণতা

বঙ্গবন্ধু দিল্লীতে গিয়েছে,সেখান থেকে আগ্রায় তাজমহল দেখতে গিয়েছে।জ্যোৎস্না রাতে তাজমহল ২য়                          বার দেখতে গিয়েছেন।আবার সেখান থেকে এসে তিনি রেনু কে চিঠি ও লিখেছেন। ঠিক এই জায়গাটিতে খুব জানতে ইচ্ছে করে বঙ্গবন্ধু কেন লিখলেন না- তাঁর মনে ও এই মানুষটির জন্য ভালবাসা ছিল ! অসমাপ্ত আত্মজীবনীর এই জায়গাটি অপূর্ণ রয়েছে –যা আমার একান্ত ব্যাকটিগত  বিশ্লেষণ।

আর ও একটি অপরনতার জায়গা রয়েছে । প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লিখা “শেখ মুজিব আমার পিতা” বইটিতে তিনি উল্লেখ করেছেন ফ্রান্সিস বেকনের একটি বই তাঁর পিতা তাকে পড়তে দিয়েছেন। কিন্ত অসমাপ্ত আত্মজীবনী তে কয়েকবার ই উঠে আসছে লেখক কারাগারে যাচ্ছেন, বই গোছাচ্ছেন। অনবরত কারাগারে যাত্রা কালে তিনি অসংখ্য বই পড়তেন।কিন্ত তিনি ঠিক কোন বই গুলো পড়তেন তার চিত্র ফোটে উঠে নি।

 

৬) বাবা মায়ের “খোকা”

বাবা মায়ের কাছে বঙ্গবন্ধু ছিলেন খোকা আর ছোট ভাই বোনদের কাছে দাদা ভাই। একটু একটু করে বেড়ে উঠা খোকা সম্পর্কে তার বাবার বক্তব্য “ যেখানে ই খোকা , সেখানে ই নেতৃত্ব । গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলের হেডমাস্টার ভাল পড়াতেন না । তখন সব ছাত্রদের নিয়ে খোকা হেডমাস্টারের বিরদ্ধে কথা বলে ।

বর্তমান প্রজন্মে ও অনেক ছেলেমেয়ে আছে যাদের সংবাদ পত্র পড়ার সময় মিলে না। প্রান্তিক গ্রাম অঞ্চল থেকে শুরু করে দেশের সকল অভ্যন্তরীণ বিষয়, সর্বোপরি বাইরের দেশে প্রতিদিন অসংখ্য ঘটনা ঘটছে যেগুলোর এক অংশ ও আমরা জানি না। কারন নিজের মস্তিষ্কের চিন্তন প্রক্রিয়া ধারা তা চিন্তা ভাবনার প্রয়োজন অনুভব করি না। কিন্তু লেখকের পিতাকে একজন সচেতন মানুষ হিসেবে দেখতে পাই।সেই ১৯২০-৩০ সালের দিকে শেখ লুৎফর রহমান বাড়ীতে খবরের কাগজ রাখতেন-আনন্দবাজার,বসুমতী,আজাদ,মাসিক মহাম্মদি এবং সওগাত।বাল্য কাল থেকেই লেখক সব পত্রিকা পড়তেন।

১৯৪২ সালের দিকে। লেখক তখন কিশোর পেড়িয়ে যুবকে পরিণত হচ্ছেন। কলকাতা যাবার সময় লেখকের পিতা তাকে বলেন“ বাবা,রাজনীতি করো আপত্তি করব না,পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করছ এ তো সুখের কথা, তবে লেখাপড়া করতে ভুলিও না”।এ কথাটির পাশাপাশি আরও দুটি উপদেশ দিয়েছেন  -ইংরেজি তে লিখা আছে। যে তোমার উদ্দেশের সততা আছে কি না তাঁর উপর বিশ্বাস করো এবং যা করছ তাতে লেগে থাকতে হবে। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন আমি আমার সারা জীবন এ কথাটি মেনে চলব- ////। এমন হীরার খণ্ডের মত উপদেশ দিয়েছেন লেখকের পিতা।

 

৭) মানবিক ঘটনা

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রার্থী ছিলেন ওয়াহিদুজ্জামান। অনেক পয়সা ওয়ালা একজন লোক। আর এদিকে জেল থেকে বের হয়ে শেখ মুজিব যুক্তফ্রন্টের হয়ে গোপালগঞ্জ গেলেন নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে।হাতে তেমন টাকা পয়সা ও নেই। গ্রামের লোক দাড়িয়ে আছে বঙ্গবন্ধু কে দেখার জন্য।তখন এক বৃদ্ধা দাড়িয়ে আছেন–বলছেন বঙ্গবন্ধু কে তাঁর কুটিরে একবার যেতেই হবে। বঙ্গবন্ধু গিয়েছেন-গিয়ে এক গ্লাস দুধ, একটি পান , আর চার আনা পয়সা দিয়ে বলেন ‘বাবা এই দুধ টুকু খান, পানটি খান আর চার আনা পয়সাটি নেন,আমার তো আর কিছু নাই—বঙ্গবন্ধু লিখলেন ‘ দুধ খেলাম, পান খেলাম আর চার আনা পয়সার সাথে আরও কিছু যোগ করে বললাম ‘ আপনার ভালবাসা পেয়েছি এটাই আমার জন্য যথেষ্ট,আর কিছু দরকার নেই”। মানবিকতার এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে বইটিতে।

 

৮)অসাম্প্রদায়িক চেতনা

বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক চেতনা উঠে এসেছে কয়েকটি অংশে। সমাজকর্মী চন্দ্র ঘোষ কখনো রাজনীতি করতেন না। তিনি মহাত্মা গান্ধীর মত একখানা কাপর পরতেন।গোপালগঞ্জে অনেক স্কুল কলেজ ও নির্মাণ করেছেন তিনি। কিন্তু পাকিস্তান হবার পর একজন সরকারি কর্মচারি সরকার কে মিথ্যা খবর দিয়ে তাকে গ্রেফতার করায়।

শেখ মুজিব তখন ফরিদপুর জেলে । তিনি দেখলেন চন্দ্র বাবু হাসপাতালে হার্নিয়া র রোগে ভুগছেন।আত্মীয় স্বজন কেউ নাই বলে নিজের অপারেশনের অনুমতি পত্র নিজে ই লিখলেন।মৃতপ্রায় চন্দ্রঘোস জীবনে শেষ বারের মত শেখ মুজিব কে দেখতে চেয়েছেন।শেখ মুজিবকে জেল গেটে নিয়া আসা হলে চন্দ্র বলেন‘ ভাই,ওরা আমাকে সাম্প্রদায়িক বলে বদনাম দিল, মরার সময় এটাই আমার কষ্ট।তবে আপনার কাছে আমার অনুরোধ মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখবেন’।শেখ মুজিব বললেন‘চিন্তা করবেন না,আমি মানুষ কে মানুষ হিসেবে ই দেখি।রাজনীতিতে মুসলমান,হিন্দু ও খ্রিস্টান বলে কিছু নাই”।উল্লেখযোগ্য কিছু জায়গায় যেখানে অসাম্প্রদায়িকতার সমাধি তে ব্যস্ত সবাই সেখানে শেখ মুজিব ছিলেন সব মানুষের নেতা।
 

৯)জেল জীবনের দুঃসহ চিত্র

১৯৫২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী বঙ্গবন্ধু কে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ফরিদপুর জেলখানায় আনা হয়েছিল।সেখানে দীরঘ দিন অনসন করার পর নানা রোগে আক্রান্তগ্রস্ত শেখ মুজিব কে নাক দিয়ে জোড় করে খাওয়াতে শুরু করেছে।নাকের ভিতর নল দিয়ে পেট পর্যন্ত দিয়ে সেই নলের মুখে আবার কাপের মত জায়গা থাকে।সেই কাপের মদ্ধে দুধের মত পাতলা করে খাবার তৈরি করে পেটের মদ্ধে খাবার দিত।বঙ্গবন্ধুর নাকের মদ্ধে অশুখ থাকাতে তিন বার খাবার দেবার পর ই ঘা হয়ে যায়।অসুস্থ মুজিব আপত্তি করলে হাতে হেনডকাপ দিয়ে বেধে তারপর খাবার পেটে প্রবেশ করাত।অর্থাৎ তাদের কথা হচ্ছে মরতে দিবে না।এমন অমানষিক অত্যাচারের মদ্ধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বঙ্গবন্ধু কে।

 

১০) কথায় কাজে এক

‘আমি মুখে যা বলি তা ই বিশ্বাস করি।আমার পেটে আর মুখে এক কথা। আমি কথা চাবাই না,যা বিশ্বাস করি তা ই বলি’।

 

১১) সেক্রিফাইসিং মাইন্ড

একবার কারামুক্তির পর বঙ্গবন্ধু এবং ফজিলাতুন্নেসা মুজিব বাড়ীতে গল্প করছিলেন। শেখ হাসিনা এবং শেখ কামাল নিচে খেলা করছে। খেলার মাঝে মাঝে শেখ হাসিনা আব্বা আব্বা বলে ডাকলেন। তখন শেখ কামাল বলে “ হাচু আপা, হাচু আপা- তোমার আব্বা কে আমি আব্বা বলি?” বঙ্গবন্ধু বিছানা থেকে উঠে শেখ কামাল কে কোলে নিয়া বলল “আমি তো তোমারও আব্বা” ।

এই ছোট শিশু পুত্র আর কন্যা শেখ হাসিনা যার বয়স কয়েক বছর মাত্র – এত মায়ার বাধন ছেড়ে তাকে বছরের পর বছর জেলে থাকতে হয়েছে।আজকের রাজনীতিবিদদের জন্য বইটির পাতায় পাতায় নির্দেশনা রয়েছে।শুধু সাহসিকতার জয়ধ্বনি গাইলে চলবে না,সততা থাকতে হবে প্রতিটি কাজে। তবে ই সৎ উদ্দেশ্য সফল হবে।

 

১২) সরল উপস্থাপনা  

বঙ্গবন্ধু লিখেছেন তিনি দিল্লি তে যাচ্ছেন টিকিট ছাড়া। আবার একটা টিকিট দিয়ে তিন জন যাচ্ছেন। এই যে নিজের সম্পর্কে সহজ ভাবে কথা বলা এ কাজটি খুব অল্প সংখ্যক মানুষের পক্ষেই সম্ভব। অনেকে হয়ত নিজের আত্মজীবনী বা নিজস্ব কোন কথনে লিখতেন–আমার জীবনে কখনো ই খারাপ কিছু করি নি। সব সময় শুধু ভাল ভাল কাজ দিয়েই জীবন পাড় করেছি ।

 

 

১৩) পারিবারিক মূল্যবোধ                                                    

পিতা লুৎফর রহমান বঙ্গবন্ধু কে বলতেন‘বাবা রাজনীতি করো ভাল কথা , তবে লেখাপড়া তা ঠিকমত করো”। সবাই সব কিছু নিয়ে যেতে পাড়ে তবে মানুষের সব চেয়ে আপন তার বিদ্যা বুদ্ধি।এটা কেউ কখনো নিয়ে যেতে পাড়ে না।এ ধরনের পারিবারিক মূল্যবোধ প্রতিটি পরিবারে ই থাকা উচিত।

আর ও একটি দৃষ্টান্তঃ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানার এক বক্তব্য থেকে পাই – ছোট বেলা থেকেই মায়ের কাছে শিখেছেন বড়দের সম্মান করতে হয়,তাদের অনুমতি ছাড়া কোন জিনিস ধরতে হয় না।শেখ হাসিনা,শেখ রেহানা দূর থেকে ই দেখতেন বেগম মুজিব যত্ন করে কিছু খাতা তার প্রিয় সব জিনিসের সাথে রাখছেন।তারা তখনও জানতেন না এই খাতা গুলোই একদিন ইতিহাসের দলিল হবে।

 

১৪) বঙ্গবন্ধু ও ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়

১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন তিনি।এরপর ছাত্র লীগ প্রতিষ্ঠা,ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া, চতুরথ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে যুক্ত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার এমন নানা ঘাত প্রতিঘাতের মদ্দ দিয়ে তিনি সময় পার করেছেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের দায়িত্ব নেবার পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট চেঞ্ছেলর হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার কথা ছিল বঙ্গবন্ধুর।বিশ্ববিদ্যালয় সেজেছিল নতুন সাজে।১৪ আগস্ট সকালে একটি মহল বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমাবাজি করলে ছাত্র নেতারা নিরাপত্তা টহল বাড়িয়ে দেয়। আগের দিন অর্থাৎ ১৪ আগস্ট রাতের খাবার শেষ করে তিনি ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ কে বললেন“তুই ডাকসুর ভিপি ছিলি,সুতরাং আমরা কাল একসাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাব।“ কিন্ত সেই দিন আর আসে নি।বঙ্গবন্ধু কে দেবার জন্য যে মানপত্র রেডি করা হয়েছিল তা এখন বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

১৫) দেশ কে ভালবাসার পাশাপাশি একান্ত ব্যক্তিগত কিছু জীবন পরিচালনা ছিল। জেল,আন্দোলন,মুক্তিযুদ্ধ সব টান টান উত্তেজনার মাঝেও তিনি নামাজ পড়তেন রেগুলার।এন্থনি মাস্কারেনহাস তার “দা রেপ অব বাংলাদেশ বই য়ে লিখেছেন ধানমণ্ডি ৩২ এ গিয়ে এক ব্যক্তিগত সক্ষাৎকারে জানতে পারি এত সব ঝামেলার মাঝেও তিনি পাচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন।অসমাপ্ত আত্মজীবনী তে নিজে লিখেছেন “আমি তখন নামাজ পরতাম, কোরআন তেলাওয়াত করতাম রুজ। কোরআন শরীফের বাংলা তর্জমা ও কয়েক খণ্ড ছিল আমার কাছে।ঢাকা জেলে সামসুল হক সাহেবের কাছ থেকে নিয়ে মাওলানা মোহাম্মাদ আলীর ইংরেজি তর্জমা ও পরেছি“।

বই পড়তে ভালবাসতেন বঙ্গবন্ধু।কয়েক বার ই জেলের একাকী জীবন এ থেকে নিজের বিবৃতি দিয়েছেন “বই ই আমার কাছে একমাত্র সম্বল “ ।

 

১৭) চীন সফর

শান্তি সম্মেলনের পর শান্তি কমিটির পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু সাংহাই পৌঁছলেন। সেখানে দুনিয়ার বিখ্যাত টেক্সটটাইল মিল দেখতে নিয়ে যাওয়া হল,বিরাট হাসপাতাল,স্কুল,কলোনি দেখানো হচ্ছিল তাদের পক্ষ থেকে।তখন বঙ্গবন্ধু বললেন “আমি শ্রমিকদের বাড়ি যাব,দেখব তারা কেমন আছে“।তিনি গিয়ে দেখলেন সেখানে মদ্দবিত্ত পরিবার গুলো ভালভাবেই বসবাস করছে,আসবাবপত্র ও মদ্দবিত্ত ঘরের আসবাবপত্র।এক বাড়ীতে গিয়ে দেখলেন সামান্য কিছু দিন পূর্বে ভদ্র মহিলার বিবাহ হয়েছে।বঙ্গবন্ধু এবং সাথের ইন্টারপ্রেনার দের কাছে উপহার দেবার মত কিছু ই ছিল না।তিনি ভাবলেন যদি কিছু না দিয়ে যাই আমার দেশের বদনাম হবে।দেখলেন হাতের আঙ্গলে একটি আংটি আছে।তৎক্ষনাৎ আংটি টি খুলে ইনটারপ্রেনার কে বললেন“আমার দেশের নিয়ম কোন নতুন বিবাহ বাড়ীতে গেলে বর কনে কে উপহার দিতে হয়”।

 

সমাপনী বক্তব্যঃ

“নেতৃত্ব গুণ নেই অথচ নেতা, নীতিবান নয় অথচ নীতিবানের মত চেহারা দিয়ে মানুষকে কল্পনা করা উচিত নয়“– বঙ্গবন্ধুর কথাটি আজকের সমাজে ও প্রযোজ্য। নেতৃত্ব গুণ থাকা চাই, নীতিবান হওয়া চাই, কাপরুষতা নয় , প্রয়োজন সাহসিকতা।নীতি আদর্শ নেতৃত্ব সাহসিকতা সব কিছুর সংস্পর্শে ই হয়ে উঠতে পাড়ে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ।

 

 

 

 

Related Posts

About The Author

Add Comment