Life is a train, not a station……..

পাওলো কোয়েলহোর আলেফ বইটি উপন্যাস না কি ভ্রমন কাহিনি তা নিয়ে বিরাট এক বিতর্ক জুড়ে দেয়া যায়। একজন লেখক তার ব্যাক্তিগত ভ্রমন কাহিনিকে এভাবে উপন্যাসের চেয়েওে সুপাঠ্য করে উপস্থাপন করতে পারেন তা এই বইটি না পড়লে আপনি কখনোই উপলব্ধি করতে পারবেন না।

২০১১ সালে প্রকাশিত এই বইটির জন্য তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করার মানসে পাওলো দীর্ঘ চার বছর প্রায় দশ হাজার কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দেন। অথচ দীর্ঘ চার বছরের সংগ্রহ করা এসব তথ্য উপাত্ত এবং ভ্রমন অভিজ্ঞতাকে মাত্র তিন সপ্তাহে একটি সুপাঠ্য উপন্যাসের আদলে সন্নিবেশিত করেন এই শক্তিশালী লেখক। তাই এটিকে ব্যক্তিগত তীর্থযাত্রার (pilgrimage) উপর ভিত্তি করা উপন্যাস হিসেবেই আমরা মেনে নিতে পারি।

লেখকের ‘আলেফ’ উপন্যাসটিতে তার কালজয়ী ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’ এর একটা ছায়াও দেখতে পাওয়া যায় অস্পষ্টভাবে। ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’ এর বিখ্যাত উদ্ধৃতি when you really want something the whole universe conspires in your favour এর মত করেই ‘আলেফ’ এ পাওলো বলেন God allows us to see such things when He wants something to change ।

এই উপন্যাসটিতে কোয়েলহো প্রেম ও আধ্যাতিকতাকে পরষ্পর সম্পুরক হিসেবে প্রকাশ করেছেন। উপরন্তু বিতর্কিত কিছু বিষয়ও লেখক এখানে তুলে এনেছেন সাবলীল ভাষায়। যেমন একই সাথে দুইজনকে ভালবাসার মতন বিষয়, যা কি না আবার প্রতারণা বা বিশ্বাসভঙ্গের সমার্থক নয়, যেন এটিই স্বাভাবিক। ‘আলেফ’ উপন্যাসে নারী পুরুষের সম্পর্ক প্রচলিত ধারা ভেঙে অন্য মাত্রায় উত্তীর্ণ করে তুলে ধরেন শক্তিমান এই লেখক। তিনি বলেন, আলিঙ্গন মানে কেবল দুটি শরীরের কাছাকাছি আসা নয়, বরং তিনি আলিঙ্গনকে আখ্যা দেন a gesture as old as humanity itself Avi Each time we embrace someone warmly we gain an extra day in life ।

এই কাহিনীর এক একটি চরিত্র তাদের কথোপকথন, অন্তর্দৃষ্টি এবং দর্শন দিয়ে আমাদের ভাবনার দুয়ারে টোকা দিয়ে যায় বারে বারে। ‘আলেফ’ এর এক একটি অধ্যায়ে পাঠকের জন্যে রয়েছে চমকের পর চমক, পাঠকের পক্ষে এই বই হাতে তুলে নিয়ে এর সাথে যাত্রায় শামিল হলেই কেবল সম্ভব সেই ম্যাজিকাল অনুভবগুলোকে স্পর্শ করা। আর এখানেই পাওলো কোয়েলহোর বিশেষত্ব।

মূল কাহিনিতে লেখকের দীর্ঘ ভ্রমনে মস্কোতে গিয়ে সাক্ষাত হয় হিলাল নামের রহস্যময়ী নারীর সাথে। হিলাল মস্কোতে তাঁর হোটেলে উপস্থিত হয়ে নাছোড়বান্দার মতন ভ্রমণ সঙ্গী হয়। তাঁর অন্যান্য ভ্রমণ সঙ্গীদের আপত্তি উপেক্ষা করেই পাওলো যেন খানিক কৌতূহল আর খানিক নিয়তির নির্দেশনায় হিলালকে সাথে নিয়ে নেন। কারণ God doesnot play dice with the Universe। আর তাঁদের এই যুগল ভ্রমণে দুজনের মধ্যে রচিত হয় অন্য মাত্রার এক সংযোগ, এক গভীর বোধের বিনিময়, আত্মিক যোগাযোগ।

পাওলো উপলব্ধি করেন, একমাত্র হিলালই পারে আরেকটি সমান্তরাল জগতের রহস্য ভেদ করতে, যেখানে পাঁচশ বছর আগে তিনি এক নারীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। এই হিলালই সেই নারী। হয়তো আরও আরও জন্মের ভেতর দিয়ে তাঁরা আজকের এই বর্তমানে পৌঁছেছেন। পাওলোর নিজের ভাষায় পুরনো ক্ষত নতুন করে খোঁচানো যেমন সহজ নয়, তেমনি খুব জরুরীও নয়। তবে এর মাধ্যমে অতীতের ভুল শুধরে নিয়ে বর্তমানকে আরও ভালভাবে বুঝতে বা সাজাতে সুবিধা হতে পারে।

পাওলোর এই উপন্যাসের মূল আকর্ষন মূলত তার রেলগাড়িতে করে মস্কোর উদ্দেশ্যে যাত্রার সময়টুকু। পাওলো এই ট্রেন ভ্রমণেই প্রথমবারের মত রহস্যময় ‘আলেফ’ এ পৌঁছান হিলাল এর সাথে ‘আই কন্ট্যাক্ট’ এর মধ্যে দিয়ে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র এই দুই নারী পুরুষ পাড়ি দেয় কয়েকশ বছর অতীত যেখানে রয়েছে অপূর্ব সব স্বপ্নের সন্ধান, অসমাপ্ত কর্ম সম্পাদনের প্রতিশ্রুতি, অন্যায়ের ক্ষমা। ট্রেন এর দুই বগীর সংযোগস্থলের মধ্যের এক প্যাসেজে গিয়ে এক বিশেষ এক্সারসাইজ এর মাধ্যমে যেটা করা সম্ভব হয়ে ওঠে।

ট্রেন শেষ স্টেশনের যত কাছাকাছি পৌঁছে, ‘আলেফ’ এর কাহিনীও ততই নাটকীয়তায় মোড় নিতে থাকে। হিলাল এবং পাওলোর মধ্যেকার আত্মিক বিনিময়ের মধ্যে দিয়েই পাঠকও যেন মানবিক সম্পর্কগুলোর সৌন্দর্যে নতুন করে মুগ্ধ হয়। ভালবাসার প্রকাশের ভাষাও এখানে কি আশ্চর্য সাবলীল যখন পাওলো হিলালকে বলে সে তাকে ভালবাসে একটা নদীর মত, অথচ তখন তাদের বিদায়ও আসন্ন।

প্রেম, ঈর্ষা, বাসনা, আত্মোপলব্ধি আর ক্ষমার অপূর্ব গ্রন্থনা ‘আলেফ’ শুধু পাওলো কোয়েলহোর ব্যাক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতার গল্প নয়,এটা আমাদের সকলের নিজস্ব গল্প। লেখকের অমীয় বানী Life is a train, not a station কথাটি আমাদেরকে বুঝিয়ে দেয়, এই একটি মাত্র ট্রেনযাত্রাই আমাদের গোটা জীবনের প্রতিকী আবহ। যাত্রার শেষে থাকে চিরন্তন আশ্বাস Love will conquer hatred…

পাওলো কোয়েলহোর উপন্যাসগুলোর ভেতরে ‘আলেফ’ উপন্যাসটিকে বলা যতে পারে তার সবচেয়ে ব্যক্তিগত উপন্যাস। এতে কখনো আছে আত্ম-উপলব্ধি, কখনো আত্মকথন, কখনো আত্ম-লিখন, কখনো আছে স্বগতোক্তি। ‘আলেফ’ এর পাওলো আর বাস্তবের পাওলোকে এক আর অভিন্ন মনে করতে একবারের অধিক চিন্তা করা লাগেনা সচেতন পাঠকদের। লেখক পাওলো কোয়েলহোর আত্মিক ও আধ্যাত্মিক টানাপোড়েন গল্পের ভেতর মূর্ত হয়ে ওঠে। উত্তম পুরুষের বর্ণনায় আমরা পরিচিত হই ষাটোর্ধ এক লেখকের সাথে।

সফলতার চূড়ায় পৌঁছেও লেখক হিসেবে তাঁর অতৃপ্তি, সেই অতৃপ্তি-বোধ নিছক দৈনন্দিন জীবন-যুদ্ধ নয়, বরং আত্মিক ও আধ্যাত্মিক অর্জনের ক্ষেত্রে শূন্যতাবোধ থেকে নিজের সাথে নিজের আধ্যাত্মিক দ্বন্দ্ব, একটা অন্তর্লীন নিঃসঙ্গতা, সেখান থেকে পরিত্রাণ এর খোঁজে শুরু হয় তাঁর আত্ম-অনুসন্ধান। গুরু ‘জে’ এর সাথে গভীর আলোচনায় পাওলো উপলব্ধি করেন যে, চারপাশের সব কিছুকে আমূল বদলে দেয়াই এই স্থবিরতা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়।

Related Posts

About The Author

Add Comment