রাজা রামমোহন রায় : তাঁর চিন্তা ও গদ্যরচনা

রাজ্য নেই, তবুও তিনি রাজা। তিনি তাঁর চিন্তার জগতে রাজা ছিলেন। তিনি যে সময়ে, যে বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করেছেন, সেই সময়ের সমাজকে চিন্তা করলে তাঁকে সংস্কারকও বলা যায়। ভারতের হুগলী জেলার রাধানগর গ্রামে রাজা রামমোহন রায়ের জন্ম। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, তাঁর জন্ম ১৭৭২ সালে, কারো মতে ১৭৭৪ সালে। তবে জন্ম তারিখ ২২ মে, এটা নিয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই। রাজা রামমোহন রায়ের পূর্বপুরুষরা রাজ পরিবারের বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত ছিলেন। রাজা রামমোহন রায়ের প্রপিতামহ কৃষ্ণচন্দ্র মুর্শিদাবাদের নবাব সরকারের চাকরিতে থাকাকালীন ‘রায় রায়ান’ উপাধি লাভ করেন। তখন থেকেই এই পরিবারের সদস্যরা রায় উপাধি ব্যবহার করেন। রাজা রামমোহন রায়ের দাদা ব্রজবিনোদ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা’র অধীনে কর্মরত ছিলেন।

রাজা রামমোহন রায়ের বাবা রামকান্তের তিন স্ত্রী ছিল। ২য় স্ত্রী ‘তারিণীদেবী’ ছিলেন রাজা রামমোহন রায়ের মা। তারিণিদেবীকে রায় পরিবারে ‘ফুল ঠাকুরাণী’ বলে ডাকা হতো। রাজা রামমোহন রায়কে ৮ বছর বয়সে প্রথম বিয়ে দেওয়া হয়। অল্প কিছুদিনের মধ্যে প্রথম স্ত্রী’র মৃত্যু হয়। তার কিছুদিন পরেই (১৭৮১) তাঁকে ২য় বিয়ে দেওয়া হয় শ্রীমতি দেবী’র সাথে। এবং পরের বছর উমাদেবী’র সাথে ৩য় বারের মত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

রাজা রামমোহন রায় যেহেতু হিন্দু এবং ব্রাহ্মণ ছিলেন, তাই তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও শুরু হয়েছিল হিন্দুধর্ম শিক্ষার মধ্য দিয়ে। শুভঙ্করী পাঠের মধ্য দিয়েই তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। সেই সময় প্রাথমিক শিক্ষা তিন স্তরের ছিল। পাঠশালা, টোল ও মক্তব। মক্তব মুসলমানদের জন্য হলেও রাজা রামমোহন রায় এই তিন স্তরেই লেখাপড়া করেছেন। হিন্দুদের মক্তবে লেখাপড়া নিষিদ্ধ, আর গোঁড়া হিন্দু অর্থাৎ ব্রাহ্মণরা মক্তবে পড়বে, এটা কখনোই কল্পনা করা যেত না। রাজা রামমোহন রায় সেটাই করেছেন যেটা ছিল ব্রাহ্মণ সমাজে নিষিদ্ধ।

তৎকালীন সময়ে আরবী-ফার্সী ভাষার বেশ কদর ছিল, বিশেষ করে ব্রাহ্মণ সমাজে। রাজা রামমোহন রায় পাটনায় (ইসলাম শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র) আরবী, ফার্সী, ইসলামী সাহিত্য, ফেকাহ্, কোরআন এবং মুসলিম সুফীদের দর্শন শাস্ত্র পড়াশোনা করেন। ইসলাম পড়তে গিয়ে তিনি একেশ্বরবাদ (এক ঈশ্বর)-এর সাথে পরিচিত হোন। আরবী ভাষায় তিনি ইউক্লিড ও এরিস্টটল পড়ে শেষ করেন। রাজা রামমোহন রায়ের জীবনীকাররা লিখেছেন,

“ইসলাম শিক্ষা কিশোর রামমোহনের চিন্তাজগতে এক বিরাট বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছিল। কোরআন-ই তাঁর ধর্মবিশ্বাসে সর্বপ্রথম এনে দিয়েছিল এক বিরাট পরিবর্তন। এই ধর্মগ্রন্থ থেকে সবচেয়ে বড় যে জিনিস তিনি লাভ করেছিলেন তা সম্ভবত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বরের মহিমা সম্বন্ধে তাঁর ধারণা। মোটকথা, ইসলাম ধর্মের উদারতা তাঁর কৈশোর জীবনেই গভীর ছায়াপাত করেছিল”। (জীবনী, রামমোহন রচনাবলী, সম্পাদক ডক্টর অজিতকুমার ঘোষ, ১৪ এপ্রিল ১৯৭৩ খ্রীষ্টাব্দ, হরফ প্রকাশনী, পৃ. ৫৮৩)

ইসলাম শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি কাশীতে চলে যান এবং সেখানে হিন্দু ধর্মের দীক্ষা নেন। তিনি আশ্চর্য হলেন, যখন দেখলেন দুই ধর্মের (ইসলাম ও হিন্দু) মূলতত্ত্ব একই। তখন তিনি ভীষণভাবে আলোড়িত হলেন। কোরআনে বলে হয়েছে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’- ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই’, আর হিন্দু উপনিষদে বলা হয়েছে, ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’— ‘ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়’। কিন্তু হিন্দু ধর্মে একাধিক ঈশ্বরের পূজা করা হতো। রাজা রামমোহন রায়ের এই দীক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেই প্রয়োজন হল গদ্যরচনা’র। এবং তিনি কলম হাতে তুলে নিলেন।

রাজা রামমোহন রায়ের চিন্তা ছিল মৌলিক এবং ধর্মীয়। তাঁর এই চিন্তাগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে যেমন কলম হাতে ধরেছিলেন, তেমনি তিনি কারো অহংবোধে আঘাত করেননি বা কারো ওপর কিছু চাপিয়েও দেননি। রাজা রামমোহন রায়ের সাথে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সাদৃশ্য আছে। দুজনেরই গদ্যরচনা ছিল মূলত মানুষের করা (যারা তাঁদের সমালোচনা করতেন) প্রশ্নের উত্তরের সংকলন। রাজা রামমোহন রায়ের বইগুলো সর্বোচ্চ ৫০ পৃষ্ঠার ছিল। এটা নিয়েও রয়েছে দ্বিমত। কোথাও লেখা আছে ২৫, কোথাও ২০ পৃষ্ঠা।

বলা হয়ে থাকে, বাংলা গদ্য প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল স্যার উইলিয়াম ফোর্ট কলেজ থেকে। কিন্তু রাজা রামমোহন রায় লিখেছেন, তাঁর যখন ১৬ বছর বয়স (১৭৮৮ খ্রীষ্টাব্দ), তখন ‘হিন্দুদিগের পৌত্তলিক ধর্মপ্রণালী’ বই লেখার অপরাধে ঘর ছেড়েছিলেন। যদিও পরবর্তীকালে এই বইয়ের কোনো কপি পাওয়া যায়নি। হিন্দুদের বিশ্বাসের আঘাত করার কারণে বইটি বাজেয়াপ্ত করা হয়।

রাজা রামমোহন রায় ইসলামকে ধারণ করলেও তিনি মুসলমান ছিলেন না। কিন্তু তাঁর চিন্তাকে অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, ইসলামের তিনটি উদ্দেশ্যকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। এগুলো হল— (১) নিজের প্রতি কর্তব্যবোধ, (২) জনগণের প্রতি কর্তব্যবোধ এবং (৩)পরমেশ্বেরের প্রতি কর্তব্যবোধ। শ্রী চৈতন্য’র মত অন্যকোনো ধর্মও তিনি তৈরী করতে চাননি। তিনি ব্রাহ্মধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন (হিন্দুদের মধ্যেই, শুধু এক ইশ্বরের প্রার্থনা)।

রাজা রামমোহন রায় ব্রাহ্মণ হলেও, ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে ছিলেন। হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণরাই জাতিপ্রথা বা জাতিবিভেদ তৈরী করেছিল। ধর্মের সকল সুবিধা তারাই ভোগ করত। রাজা রামমোহন রায় এর প্রতিবাদ করেছিলেন। ‘ভগবান মনুর বচন’ বলে, ব্রাহ্মণরা প্রমাণ করতে চাইতেন তারাই ঈশ্বরের পুত্র আর সংস্কারকরা উপনিষদ থেকে উত্তর দিতেন, “শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ”, অর্থাৎ “বিশ্বে মানুষই হল ঈশ্বরের পুত্র”।

রাজা রামমোহন রায় যেমন ইসলাম আর হিন্দু ধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন, তেমনি অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কেও তাঁর শিক্ষা ছিল। তথাপি তিনি হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করেননি। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, ‘সম্রাট দ্বিতীয় আকবরের প্রতিনিধি হয়ে যখন তিনি ইংল্যান্ড গমন করেন, সাথে করে তিনি দেশীয় গরু নিয়ে গিয়েছিলেন দুধ পান করার জন্য, যাতে তাঁর জাত না চলে যায়’। তিনি সকল ধর্ম থেকে সুন্দরগুলো নিয়েছিলেন। রাজা রামমোহন রায় ব্রাহ্মণ সমাজ ভেঙ্গে ব্রাহ্ম সমাজ গড়তে চেয়েছিলেন। তাঁর এই আন্দোলন গতি লাভ করে যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচারণায় যুক্ত হন। বলা হয়ে থাকে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিন্দু ছিলেন, আসলে তিনি ব্রাহ্ম ছিলেন। হিন্দুদের যে একটা বৃত্ত আছে, যেটা ব্রাহ্মণরা তৈরি করেছিলেন, সেই বলয়ের সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ছিল ব্রাহ্ম ধর্ম। যেখানে শুধু এক ঈশ্বরের প্রার্থনা করা হয়।

হিন্দুদের একাধিক ঈশ্বর বিশ্বাসের পৌত্তলিকতা’র বিরোধিতার পর সতীদাহ প্রথা রদের জন্য তাঁর আন্দোলনের জন্য তিনি পরিচিতি পান। সতীদাহ প্রথা শুধুমাত্র চালু ছিল ব্রাহ্মণদের জন্য। ব্রাহ্মণরা বিশ্বাস করতেন, সতীদাহ করা হলে স্ত্রী’র মাতৃকুল, পিতৃকুল এবং শ্বশুরকুল স্বর্গে যাবেন। ব্রাহ্মণরা কখনই চাইত না অন্য জাতগুলো এই সুবিধাটুকু পাক। তাই ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য জাতিদের জন্য এটা নিষিদ্ধ ছিল। বিভিন্ন প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা কেন রদ করা উচিত তার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।

রাজা রামমোহন রায় তাঁর গবেষণার শাখা প্রশাখায় এসবের প্রতি দৃষ্টিপাত করে মূল সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন, মূল সমস্যাকে উৎখাতের চেষ্টা করেছেন। তিনি চেষ্টা করেছেন হিন্দু ধর্মের প্রচলিত সকল কুপ্রথার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে। তাঁর ধর্ম বিশ্বাস ছিল অনেকটা সম্রাট আকবরের ‘দ্বীনে এলাহী’র চিন্তাচেতনার মত সকল ধর্মের সমন্বয়ের পক্ষে। তবে সম্রাট আকবরের মতো হলেও একেবারে একই জিনিস ছিল না, প্রচুর ব্যবধান ছিল দুজনের কর্মে ও চিন্তায়। সম্রাট আকবর ভারতবর্ষের প্রতাপশালী সম্রাট ছিলেন এবং নিজেকে ফেরাউনের মতো ‘আকবর দ্য গ্রেট’ ভাবতেন। আর রাজা রামমোহন রায় ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ, চিন্তক ও শিক্ষিত। তাই রাজা রামমোহন রায়ের ‘ব্রাহ্ম ধর্ম’ কে ‘দ্বীনে এলাহী’ বলা যাবে না। রামমোহন হিন্দু ধর্মের বহু দেবদেবীর পূজাকে অস্বীকার করেছেন মূলত হিন্দু ধর্ম থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য নয়, বরং তিনি চেয়েছেন হিন্দু ধর্ম মনুর ভ্রান্ত বচন থেকে বেদ-বেদান্ত-উপনিষদে ফিরে আসুক। তিনি কৈশোর জীবন থেকেই এক ঈশ্বরের কথা বলে আসছেন। শাস্ত্রীয় বিধান ‘যবনের ঘরে কিংবা যবনের হাতের খাদ্য গ্রহণ পাপ’ তিনি মানতেন না। তাঁর ঘরে যে বাবুর্চি রান্না করতেন, তিনি ছিলেন মুসলমান। (গোলাম মুরশিদ, কালাপানির হাতছানি, আমার দেশ, বিশেষ রচনা, ঈদ সংখ্যা, ঈদুল ফিতর ২০০৭)

তবে এটা সত্য যে, রামমোহনের ‘ব্রাহ্ম সমাজ’ তাঁর মৃত্যুর পর হিন্দু ধর্মের বাইরে যাওয়ার ঘোষণা না দিলেও হিন্দু ধর্মের মধ্যেও থাকেনি। বিশ্ব উপাসনালয় (Church Universal) নামে তারা যে উপাসনালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেটা আর মন্দির না থেকে খ্রীষ্টানদের চার্চের আদলে বদলে গিয়েছে।

This article was first published on thereport24.com in 16th October 2015

– See more at: http://www.bm.thereport24.com/article/130607/index.html

Related Posts

About The Author

Add Comment